চোখ মানুষের অমূল্য সম্পদ। আর এই চোখের ত্রুটি দূর করতে আমরা চশমা ব্যবহার করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, দামী অপটিক্যাল শপ থেকে যে ‘অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিভ’ বা ‘ব্লু-কাট’ লেন্স কিনছেন, তার একটি বড় অংশই সাধারণ সস্তা প্লাস্টিক?
ব্র্যান্ডের ফ্রেমের নামে রেপ্লিকা গছিয়ে দেওয়া কিংবা লেন্সের পাওয়ারে সূক্ষ্ম কারসাজি এখন চশমার বাজারের সাধারণ চিত্র। ভুল লেন্সের কারণে আপনার চোখের পাওয়ার কমার বদলে উল্টো মাথা ব্যথা এবং দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে চশমার দোকানের পেছনের কিছু চতুর জালিয়াতি বেরিয়ে এসেছে।
চশমার বাজারে যেভাবে চলে ‘দৃষ্টিভ্রম’ জালিয়াতি
১. লেন্সের কোয়ালিটি নিয়ে ধোঁকা: সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয় লেন্সের কোটিং (Coating) নিয়ে। আপনাকে বলা হলো এটি ‘ব্লু-কাট’ বা ‘ইউভি প্রটেক্টেড’ লেন্স, যার দাম রাখা হলো কয়েক হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে সাধারণ ৫০০-৬০০ টাকার লেন্সে একটি নীল রঙের প্রলেপ দিয়ে তা চালিয়ে দেওয়া হয়। এসব লেন্স ক্ষতিকর রশ্মি আটকাতে পারে না, ফলে কম্পিউটার বা মোবাইলের আলো সরাসরি আপনার চোখের রেটিনার ক্ষতি করে।
২. ব্র্যান্ডের ফ্রেমের রেপ্লিকা: Ray-Ban, Oakley বা Gucci-র মতো দামী ব্র্যান্ডের ফ্রেমের হুবহু নকল বা ‘মাস্টার কপি’ বাজারে সয়লাব। সাধারণ প্লাস্টিক বা নিম্নমানের ধাতু দিয়ে তৈরি এসব ফ্রেমের রঙ অল্প দিনেই উঠে যায় এবং কানে বা নাকে অ্যালার্জি তৈরি করতে পারে। আসল ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে এগুলো কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
৩. পাওয়ারের ভুল ও নিম্নমানের গ্রাইন্ডিং: চশমার লেন্স কাটার সময় (Grinding) যদি ফোকাস পয়েন্ট সামান্য এদিক-ওদিক হয়, তবে সেই চশমা পরলে আপনার মাথা ঘুরবে এবং চোখে প্রচণ্ড চাপ পড়বে। অনেক ছোট দোকানে দক্ষ টেকনিশিয়ান না থাকায় এবং সস্তা মেশিন ব্যবহার করায় লেন্সের ফিনিশিং সঠিক হয় না।
৪. কন্টাক্ট লেন্সের ভয়াবহ ঝুঁকি: ফ্যাশন বা প্রয়োজনের খাতিরে অনেকে কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন। সস্তা ও অনুমোদনহীন কন্টাক্ট লেন্স বা মেয়াদোত্তীর্ণ সলিউশন ব্যবহারের ফলে চোখের কর্নিয়ায় আলসার বা অন্ধত্বের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনেক দোকানে কন্টাক্ট লেন্সের মেয়াদের তারিখ ঘষামাজা করে বিক্রি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
চশমা বা লেন্স কেনার সময় যা করবেন:
লেন্সের প্যাকেট সংগ্রহ করুন: চশমা বানানোর পর লেন্সের মূল প্যাকেটটি দোকানদারের কাছ থেকে চেয়ে নিন। প্যাকেটের গায়ে ব্র্যান্ডের নাম, পাওয়ার এবং লেন্সের বৈশিষ্ট্য (যেমন- Blue cut, HMC) লেখা থাকে। সেটি না দিলে বুঝবেন আপনি প্রতারিত হয়েছেন।
ইউভি (UV) টেস্ট করিয়ে নিন: অধিকাংশ ভালো দোকানে ইউভি টেস্টিং মেশিন থাকে। লেন্সটি আসলেও ক্ষতিকর রশ্মি আটকাতে পারছে কি না, তা চোখের সামনে পরীক্ষা করিয়ে নিন।
ফ্রেমের ফিনিশিং ও লোগো: আসল ব্র্যান্ডের ফ্রেমের ভেতরে মডেল নম্বর এবং মেজারমেন্ট খোদাই করা থাকে। প্রিন্ট করা লোগো বা হালকা ওজনের প্লাস্টিক ফ্রেম হলে তা এড়িয়ে চলুন।
ভালো অপটিক্যাল শপ ও বিশেষজ্ঞ: কেবল চোখের পাওয়ার পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে চশমা বানাবেন না। আগে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ (Ophthalmologist) দেখিয়ে সঠিক প্রেসক্রিপশন নিন এবং সেটি বিশ্বস্ত কোনো শপ থেকে তৈরি করান।
চোখের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা মানে নিজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করা। চশমার বাজারে কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতি দেখলে ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করুন। মনে রাখবেন, একটি ভুল চশমা আপনার দৃষ্টিশক্তিকে আরও ঝাপসা করে দিতে পারে।