বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য বিকাশ ও আন্তর্জাতিক রুটে জাতীয় পতাকাবাহী জাহাজের বহর সমৃদ্ধ করতে সমুদ্রগামী জাহাজ আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়েছে সরকার। তবে একই প্রজ্ঞাপনে কর ছাড়ের সুবিধা পেতে জাহাজের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৫ বছর থেকে একলাফে ১০ বছরে নামিয়ে আনা এবং পণ্য পরিবহনে পরিচালনার ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা ৩ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর নির্ধারণ করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে দেশের নৌ-বাণিজ্য খাতে।
সরকারিভাবে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য থাকলেও, শিপিং খাতের উদ্যোক্তা ও মেরিটাইম পেশাজীবীদের মতে, দেশীয় আর্থিক বাস্তবতা ও সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে এমন কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ায় উল্টো দেশীয় নৌবহর সংকুচিত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ন্যূনতম ৫০০০ ডেডওয়েট টন বা ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সমুদ্রগামী জাহাজ আমদানিতে মূসক অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে সুবিধা পেতে হলে জাহাজটির বয়স কোনোভাবেই ১০ বছরের বেশি হওয়া চলবে না এবং আমদানির পর তা অন্তত ৫ বছর বাংলাদেশের পতাকাবাহী হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। পূর্বে এ বয়সসীমা ছিল সর্বোচ্চ ২৫ বছর এবং পরিচালনার সময়সীমা ছিল ৩ বছর।
সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাজ মালিক, অভিজ্ঞ মাস্টার মেরিনার ও শিপিং বিশ্লেষকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পুনর্বিবেচনার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, বাংলাদেশের বেসরকারি শিপিং খাত এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে সাধারণ উদ্যোক্তারা বিপুল মূলধন খাটিয়ে ঢালাওভাবে নতুন বা ১০ বছরের কম বয়সী জাহাজ কেনার আর্থিক সক্ষমতা রাখেন।
তারা জানান, বিশ্ববাজারে একটি নতুন বা কম বয়সী জাহাজের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সুসংরক্ষিত ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী সেকেন্ড-হ্যান্ড জাহাজের মূল্যের ব্যবধান কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে বয়সের সীমারেখা ১০ বছরে নামিয়ে আনলে উচ্চ বিনিয়োগের চাপ সামলাতে না পেরে অধিকাংশ মাঝারি ও নতুন উদ্যোক্তা জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসবেন। এর ফলে বাজারে একটি বড় আকারের এন্ট্রি ব্যারিয়ার তৈরি হবে, যা পুরো খাতকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বৃহৎ করপোরেট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ঠেলে দিতে পারে।
অংশীজনরা আরও সতর্ক করে জানিয়েছেন, কম বয়সী জাহাজ আমদানির মাধ্যমে এনবিআরের রাজস্ব বাড়ানোর যে প্রাথমিক হিসাব থাকতে পারে, বাস্তবে তা বিপরীত রূপ নিতে পারে। জাহাজ আমদানির সংখ্যা যদি ব্যাপকভাবে কমে যায়, তবে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ধস নামবে। এর চেয়েও মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের বহর বাড়লে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ফ্রেইট বা ভাড়ার বড় একটি অংশ দেশে সংরক্ষিত থাকে। বিপরীতে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা কমে গেলে পণ্য পরিবহনে বিদেশি শিপিং লাইনের ওপর নির্ভরতা বহুগুণ বাড়বে। ফলে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো পরিবহনের ফ্রেইট ও চার্টার চার্জ বাবদ প্রতি বছর শত শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বাইরে চলে যাবে।
জাহাজের নিরাপত্তা ও কারিগরি মানদণ্ড প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ মেরিটাইম পেশাজীবীরা স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল বয়স দিয়ে কোনো জাহাজের সমুদ্র-সক্ষমতা বা সি-ওয়ার্দিনেস নির্ধারণ করা পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির মানদণ্ড মেনে নিয়মিত সার্ভে সম্পন্ন, হাল ও মেশিনারিজের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) নিরাপত্তা বিধি মেনে বিশ্বজুড়ে বহু জাহাজ ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত নিরাপদ ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনকভাবে চলাচল করছে। তাই বয়সের পাশাপাশি জাহাজের সার্বিক অবস্থা, ক্লাসিফিকেশন হিস্ট্রি, পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল রেকর্ড ও সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সমন্বয়ে যোগ্যতা নির্ধারণ করা অধিক যৌক্তিক।
নৌ খাতের সঙ্গে সহায়ক শিল্প হিসেবে যুক্ত রয়েছে নাবিকদের কর্মসংস্থান, শিপ ম্যানেজমেন্ট, ম্যানিং এজেন্সি, ড্রাইডকিং, শিপ রিপেয়ার, মেরিন সাপ্লাই, ব্যাংক, বিমা ও বন্দর সংশ্লিষ্ট সেবা খাত। ফলে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির বহুমুখী সংযোগ রয়েছে। এ কারণে কোনো বিশেষ স্বার্থের বাইরে গিয়ে মাস্টার মেরিনার, নেভাল আর্কিটেক্ট, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, শিপ ওনার এবং অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি স্বাধীন উপদেষ্টা কমিটির মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক প্রভাব মূল্যায়নের তাগিদ দিয়েছেন অংশীজনরা।
নৌ-বাণিজ্যের টেকসই প্রবৃদ্ধির স্বার্থে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এককালীন সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে ধাপে ধাপে রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বয়সসীমা সরাসরি ২৫ থেকে ১০ বছরে না নামিয়ে ক্রমান্বয়ে কমানো, ভালো কন্ডিশন ও ক্লিন সেফটি রেকর্ড থাকা জাহাজের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় রাখা, জাহাজের বয়সের পাশাপাশি কারিগরি মানকে মুখ্য বিবেচনা করা এবং দেশীয় শিল্পকে খাপ খাইয়ে নিতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড দেওয়া।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই সরকারের উচিত শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, সিফেয়ারার প্রতিনিধি, নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও এনবিআরের সমন্বয়ে আলোচনার টেবিলে বসে এ নীতিমালার একটি বাস্তবসম্মত সমন্বয় সাধন করা।










