Home মিডিয়া ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের আগ্রাসন: অস্তিত্ব সংকটে বৈশ্বিক প্রিন্ট মিডিয়া

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের আগ্রাসন: অস্তিত্ব সংকটে বৈশ্বিক প্রিন্ট মিডিয়া

ফরিদুল আলম

বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ঐতিহ্যগত প্রিন্ট মিডিয়া (সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন) ছেড়ে বৈশ্বিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পুরোপুরি অনলাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কম খরচে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক (Targeted) পাঠক বা ক্রেতার কাছে নিখুঁতভাবে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে ডিজিটাল মাধ্যম এখন বিজ্ঞাপনের মূল চালিকাশক্তি।

এর বিপরীতে, বিশাল ছাড় বা আকর্ষণীয় অফার দিয়েও প্রিন্ট মিডিয়া আর বিজ্ঞাপনদাতাদের ফেরাতে পারছে না, যা বিশ্বজুড়ে কাগজের সংবাদপত্রকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন কেন ডিজিটালমুখী? প্রিন্ট মিডিয়ার তুলনায় অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগের প্রধান কারণগুলো হলো:
  • মাইক্রো-টার্গেটিং ক্ষমতা: সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ব্যবহার করে একজন নির্দিষ্ট বয়স, পেশা, এলাকা এবং পছন্দের মানুষের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছানো যায়, যা খবরের কাগজে সম্ভব নয়।
  • খরচের বিশাল সাশ্রয়: প্রিন্ট মিডিয়ায় একটি বড় বিজ্ঞাপনের জন্য যে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়, তার ক্ষুদ্র একটি অংশ ব্যয় করে অনলাইনে বহুগুণ বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
  • রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং: ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে কতজন মানুষ ক্লিক করলেন, কতজন পণ্য কিনলেন তা তাৎক্ষণিক পরিমাপ করা যায়। প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের এমন কোনো সঠিক উপায় নেই।
জাপানের চিত্র: বিশ্বের বৃহত্তম সংবাদপত্র বাজারের পতন
বিজ্ঞাপনের এই রূপান্তর এবং কাগজের পত্রিকা কিনে পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে জাপান। যে দেশটিকে বিশ্বজুড়ে প্রিন্ট মিডিয়ার “সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ” বলা হতো, সেখানেও এখন ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। জাপানের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনী ও মিডিয়া ডেটা বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ঐতিহাসিক রেকর্ড: জাপানের শীর্ষ বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ডেন্টসু’ (Dentsu)-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের মোট বিজ্ঞাপন বাজারের আকার ৮ ট্রিলিয়ন ইয়েন ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট বা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অংশ ৫০.২% অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, দেশের মোট বিজ্ঞাপনী বাজেটের অর্ধেকের বেশি চলে গেছে অনলাইন, ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পকেটে। ভিডিও বিজ্ঞাপন একাই ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনের গণ্ডি পার করেছে।
পত্রিকা সংবহনে (Circulation) নজিরবিহীন ধস: রয়টার্স ইনস্টিটিউট এবং জাপানি মিডিয়া ডেটা অনুযায়ী, ২০০৪ সালেও জাপানে দৈনিক পত্রিকার মোট সার্কুলেশন ছিল ৫ কোটি ৩০ লাখ (৫৩ মিলিয়ন)। ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে তা নেমে এসেছে মাত্র ২ কোটি ৬০ লাখে (২৬ মিলিয়ন)। অর্থাৎ, মাত্র দুই দশকে জাপানে সংবাদপত্র কিনে পড়ার হার ৫০% এর বেশি কমে গেছে এবং প্রতি বছর গড়ে ৪% হারে এই পতন অব্যাহত রয়েছে।
খরচ কাটছাঁট ও কর্মী ছাঁটাই: জাপানের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ‘আসাহি শিম্বুন’ (Asahi Shimbun) তাদের ব্যুরো অফিস ৩২১টি থেকে কমিয়ে ১৭৮টিতে নামিয়ে এনেছে। তাদের নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস ৩২টি থেকে কমিয়ে ২৪টি করা হয়েছে এবং হাজার হাজার কর্মী ও সাংবাদিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিতরণ নেটওয়ার্কের যৌথ ব্যবহার: এক সময় জাপানের শীর্ষ ৫টি জাতীয় দৈনিকের নিজস্ব এবং পৃথক দোরগোড়ায় পত্রিকা পৌঁছানোর (Home delivery) ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু গ্রাহক এত কমে গেছে যে, এখন পরিবহন ও কাগজের খরচ বাঁচাতে প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকাগুলো বাধ্য হয়ে একই বিতরণ নেটওয়ার্ক শেয়ার করছে।
ব্যতিক্রমী মডেল: নিক্কেই (Nikkei): জাপানের সব পত্রিকা যখন সংকটে, তখন ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে অর্থনৈতিক দৈনিক ‘নিক্কেই’। তারা সফলভাবে করপোরেট ও বিজনেস (B2B) ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন মডেল দাঁড় করিয়েছে, যার ফলে তাদের পেইড ডিজিটাল সাবস্ক্রাইবার এখন ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা তাদের প্রিন্ট সার্কুলেশনের কাছাকাছি। তবে সাধারণ ধারার পত্রিকাগুলো (যেমন আসাহি বা মাইনিচি) ‘ফ্রি নিউজ কালচার’ বা ইয়াহু নিউজের মতো ফ্রি এগ্রিগেটর অ্যাপের জনপ্রিয়তার কারণে ডিজিটাল থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব তুলতে পারছে না।
ডিজিটাল মাধ্যমের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার মুখে টিকে থাকতে বিশ্বব্যাপী এবং বিশেষ করে জাপানের প্রিন্ট মিডিয়া এখন শুধু বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেটা-ড্রিভেন মেম্বারশিপ এবং হাইপার-লোকাল ডিজিটাল সংস্করণের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

আরও নানা বিষয় জানতে ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com