Home অন্যান্য পলিটিক্সের জাদুকর

পলিটিক্সের জাদুকর

অফিস রাজনীতি
স্মৃতি সরকার
খুলনার রূপসা নদীর পাড়ে যখন গোধূলির আলো এসে পড়ত, অবিনাশ সরকার তখন নদীর দিকে তাকিয়ে জলের হিসাব করতেন না, তিনি করতেন মানুষের মাথার হিসাব। যশোর থেকে আসা এই মানুষটার ঝুলিতে সাংবাদিকতার জ্ঞান যতটুকু ছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ছিল মানুষকে পড়ার ক্ষমতা। অবিনাশ জানতেন, লোহা কাটার জন্য করাত লাগে, কিন্তু মানুষ কাটার জন্য লাগে শুধু সঠিক সময়ে সঠিক একটা শব্দ।
খুলনার মফস্বল ঘরানার একটা ছোট দৈনিকে যখন তিনি কাজ শুরু করেন, তখন থেকেই তার মূল কাজ ছিল ‘কাজের চেয়ে প্রচার বেশি’। সামান্য একটা প্রেস রিলিজ করে ডেস্কে পাঠানোর পর হাবভাব এমন দেখাতেন যেন তিনি নিজেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লাইভ রিপোর্ট করে এসেছেন। কিন্তু অতি চালাকের গলায় দড়ি পড়তে সময় লাগে না। অল্প দিনেই সেই অফিস তার ধূর্ততার গন্ধ পেয়ে তাকে বিদায় করে দিল।
তবে অবিনাশ দমে যাওয়ার পাত্র নন। স্থানীয় এক প্রভাবশালী সংবাদপত্র এজেন্টের পা চাটতে চাটতে বাগিয়ে নিলেন রাজধানীর এক নামী দৈনিকের খুলনা ব্যুরোতে অস্থায়ী পদ। অবিনাশ ভেবেছিলেন এবার কেল্লাফতে! কিন্তু তার কপাল খারাপ, ঢাকার ডেস্কে বসা বার্তা সম্পাদক শফিক আহমেদ ছিলেন ওল্ড স্কুলের ঝানু সাংবাদিক। অবিনাশ ফোনে মুখে ফটর ফটর করতেন অনেক, কিন্তু কাজের বেলায় ঠনঠন। এক সন্ধ্যায় শফিক আহমেদ খুলনা ব্যুরো প্রধানকে ফোন করে বললেন, “আপনার এই অবিনাশ ছোকরা তো কিচ্ছু জানে না, কেবল উপন্যাসের প্লট শোনায়। কাজের কাজ শূন্য। অস্থায়ী পিরিয়ড শেষ হওয়ার দরকার নেই, কাল থেকে ওকে আসতে বারণ করে দিন।”
টানা তিন মাস বেকার থাকার পর অবিনাশ তার জীবনের সবচেয়ে বড় চালটি চাললেন। খুলনার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘কপোতাক্ষ বার্তা’ পত্রিকায় এক প্রকার লবিং করেই ঢুকে পড়লেন।
ঢুকেই অবিনাশের নজর পড়ল অফিসের চাদরে। সেখানে তখন রাজত্ব করছেন শুভ্রজিৎ—পত্রিকাটির সবচেয়ে চৌকস, সৎ এবং দুর্দান্ত সাহসী ক্রাইম রিপোর্টার। অবিনাশ ভাবলেন, শুভ্রজিৎকে ডিঙাতে পারলে এক লাফে ওপরে ওঠা যাবে। তিনি শুভ্রজিতের একটা এক্সক্লুসিভ স্টোরির সোর্স চুরি করে নিজেই ফাইল করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শুভ্রজিৎ কাঁচা খেলোয়াড় নন। তিনি আগে থেকেই পেতে রাখা ফাঁদে অবিনাশকে এমনভাবে জড়ালেন যে, ভুল তথ্যের কারণে অবিনাশকে পুরো অফিসের সামনে সম্পাদকের চরম ঝাড়ি খেতে হলো।
সেই ধাক্কায় অবিনাশের অহংকার মুখ থুবড়ে পড়ল। বেশ কিছুদিন তিনি একদম চুপচাপ হয়ে গেলেন। অফিসে আসেন, কোণায় বসেন, চা খান। কিন্তু তার ভেতরে জ্বলছিল প্রতিশোধ আর ক্ষোভের আগুন। তিনি বুঝলেন, দক্ষতা দিয়ে এই বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের সাথে পারা যাবে না। জিততে হলে পথ বদলাতে হবে।
‘তৈল’ থেরাপি ও কানভারির খেলা
অবিনাশ লক্ষ্য করলেন, পত্রিকার মালিক ও প্রধান সম্পাদক আলতাফ সাহেব একটু স্তাবকতা পছন্দ করেন। আলতাফ সাহেব যখনই অফিসে আসতেন, অবিনাশ ফাইল বগলে নিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আলতাফ সাহেবের সুগারের সমস্যা জেনে অবিনাশ পরদিনই ঢাকা থেকে স্পেশাল সুগার-ফ্রি মিষ্টি আনিয়ে হাজির করলেন। আলতাফ সাহেবের কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলে অবিনাশ সেটাকে ‘শতাব্দীর সেরা ভাষণ’ বলে ডেস্কে হইচই বাঁধিয়ে দিতেন।
ধীরে ধীরে অবিনাশের প্রবেশ ঘটল আলতাফ সাহেবের খাস কামরায়। শুরু হলো আসল খেলা—’কানভারি রাজনীতি’। অবিনাশ সরাসরি কারও নিন্দা করতেন না। তিনি খেলতেন সহানুভূতির চাল। আলতাফ সাহেবের সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলতেন, “স্যার, শুভ্রজিৎ ছেলেটা রিপোর্টার ভালো, কিন্তু শুনলাম বিরোধী দলের এক নেতার সাথে কাল রাতে গোপনে কফি খাচ্ছিল। কপালে কী আছে কে জানে! আপনার পত্রিকার ইমেজটা যদি নষ্ট করে…”
ব্যাস, বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়ে গেল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আলতাফ সাহেবের মনে শুভ্রজিতের প্রতি সন্দেহ দানা বাঁধল। একটা তুচ্ছ অজুহাতে শুভ্রজিৎকে চাকরিচ্যুত করা হলো।
চূড়ার লড়াই এবং চূড়ান্ত চাল
শুভ্রজিতের বিদায়ের পর অবিনাশের পথের কাঁটাগুলো একে একে সরতে লাগল। ডেস্কেও তার চালবাজি চলতে থাকল। কোনো সহকর্মী একটু ছুটি নিলেই অবিনাশ মালিকের কানে তুলতেন, “স্যার, অমুকের বোধহয় অন্য কোথাও কথা পাকা হয়েছে, তাই অফিসে মন নেই।” বিগত এক দশকে ‘কপোতাক্ষ’ পত্রিকা থেকে ডজনখানেক দক্ষ সাংবাদিক বিদায় নিলেন—কেউ অপমানে, কেউ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। আর প্রতিটা বিদায়ের পেছনে অদৃশ্য সুতোর টানটা ছিল অবিনাশের।
দশ বছরের মাথায় অবিনাশ যখন প্রায় চূড়ায়, তখন তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধু একজন—বার্তা প্রধান প্রবীণ সাংবাদিক রহমান ভাই। রহমান ভাই যেমন সৎ, তেমনি আলতাফ সাহেবের পুরনো বিশ্বস্ত। তাকে সরানো অত সহজ ছিল না।
অবিনাশ এবার চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে কুৎসিত চালটি চাললেন। রহমান ভাইয়ের টেবিল থেকে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল খবরের ড্রাফট চুরি করে অবিনাশ সেটা প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকার এক রিপোর্টারকে লিক করে দিলেন। পরদিন প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকায় খবরটি ছাপা হতেই আলতাফ সাহেবের মাথা গরম হয়ে গেল। অবিনাশ ঠিক সেই মুহূর্তেই আলতাফ সাহেবের রুমে ঢুকলেন। মুখে তার কৃত্রিম দুঃখের ছাপ। তিনি বললেন, “স্যার, রহমান ভাইয়ের বয়স হয়েছে। কাল রাতে ওনার টেবিল থেকেই নাকি ফাইলটা খোয়া গেছে। আমি তো ওনাকে অনেকবার বলেছি সিন্দুকটা লক করতে…”
আলতাফ সাহেবের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস এক মুহূর্তের সন্দেহে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রহমান ভাইকে ডেকে চরম অপমান করা হলো। আজন্ম সৎ এই মানুষটি অপমান সহ্য করতে না পেরে টেবিল চাপড়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সিংহাসনে অবিনাশ
পরদিন সকালে ‘কপোতাক্ষ’ পত্রিকার নিউজ রুমের বাতাস ছিল ভারী ও থমথমে। সবাই চুপচাপ নিজেদের কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে। ঠিক বেলা ১২টায় অবিনাশ সরকার ধোপদস্ত সাদা শার্ট পরে, মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি নিয়ে রিপোর্টিং প্রধানের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। তার টেবিলে এখন নেমপ্লেট জ্বলজ্বল করছে—‘অবিনাশ সরকার, রিপোর্টিং ইনচার্জ’।
তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে জানালা দিয়ে খুলনার আকাশের দিকে তাকালেন। কাজে তার দক্ষতা সর্বনিম্ন হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে কীভাবে হাঁটতে হয়, তা আজ তার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। অবিনাশ মুচকি হাসলেন; যোগ্যতা যেখানে হার মেনেছে, সেখানে আজ দাপটের সাথে জিতেছে নিখাদ রাজনীতি।