প্রতিযোগী দেশগুলোর উত্থানে বাড়ছে উদ্বেগ
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) এই বাজারে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানি আয় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বছরের শুরুর পাঁচ মাসের চিত্র দেশের প্রধান এই শিল্প খাতের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিস (অটেক্সা)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে ৩.২৪৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই মন্দাভাবের মধ্যেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভীতি জাগাচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলোর ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি ১৪.৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৫.৪৯ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধিও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ কেবল আয়ের দিক থেকেই পিছিয়ে পড়েনি, বরং রপ্তানির পরিমাণেও বড় ধাক্কা খেয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে ১০৮ কোটি ৫ লাখ স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট (এসএমই) পোশাক পাঠানো হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬.২১ শতাংশ কম। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো পণ্যের দরপতন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৩.০৫ ডলার থেকে প্রায় ২ শতাংশ কমে ২.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে।
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ সরে আসলেও প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার অভাবে বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা দিয়ে বাজার নিজেদের দখলে নিচ্ছে। যেখানে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে নীতিগত ছাড় দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে পোশাক খাতে ২৭ শতাংশ কর আরোপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চরমভাবে মার খাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তীব্র জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক সাপোর্টের ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একই সাথে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতিও এই মন্দার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র পরিচালক ফয়সাল সামাদ জানান, গত প্রায় ছয় মাস ধরে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে এক ধরনের বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগের বছর দেওয়া অনেক ক্রয়াদেশের বাস্তবায়নও ক্রেতারা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছেন।
তবে এই দীর্ঘ হতাশার মধ্যেও মে মাসের একক পরিসংখ্যানে কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে। অটেক্সার তথ্য বলছে, শুধু মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.০৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও ওই মাসেও ইউনিট মূল্য ০.৮৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পোশাক খাতের এই ধারাকে স্থায়ী ইতিবাচক রূপ দিতে হলে সরকারকে দ্রুত অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট দূর করতে হবে এবং কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসসহ দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, অন্যথায় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।










