এবিবির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরব চিটাগাং চেম্বার: আমিরুল হকের কড়া প্রতিক্রিয়া
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণ ও নানা অনিয়মের কারণে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ফির বোঝা চাপানোর এক বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। মাসে মাত্র তিনবারের বেশি নিজের জমা টাকা তুলতে গেলেই গুণতে হবে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা! শুধু তাই নয়, স্থগিত হিসাব সচল করা থেকে শুরু করে আরও ১৪টি নতুন সেবায় ফি আরোপ এবং বিদ্যমান চার্জ চারগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর এমন আগ্রাসী ও অযৌক্তিক প্রস্তাবের পর সাধারণ গ্রাহক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
নিজেদের ব্যর্থতার দায় গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকগুলোর মূল আয় হওয়ার কথা ঋণ বিতরণ এবং তা থেকে সুদ আদায়ের মাধ্যমে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী ও বড় খেলাপিদের পেছনে ছুটে হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকগুলো। এখন সেই খেলাপি ঋণের কারণে হওয়া লোকসান ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে তারা টার্গেট করছে নিরীহ ও সাধারণ গ্রাহকদের। নিজেদের অপেশাদারিত্ব ও ব্যর্থতার দায় গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানোর এই চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গ্রাহকের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক নিপীড়ন
নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে রেখে যদি তা তোলার জন্যই গ্রাহককে জরিমানা দিতে হয়, তবে তা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। মাসে মাত্র তিনবার টাকা তোলার সীমা নির্ধারণ করা অত্যন্ত অবাস্তব। একজন সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে মাসে বহুবার টাকা তোলার প্রয়োজন হতে পারে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রচারণার অজুহাতে প্রান্তিক ও সাধারণ গ্রাহকদের এভাবে জিম্মি করে টাকা আদায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পকেট কাটার শামিল।
ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা সংকট ও ক্যাশ আউটের প্রবণতা
এমনিতেই নানা কেলেঙ্কারির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে। এর ওপর যদি টাকা তুলতে বাড়তি কর বা ফি দিতে হয়, তবে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রাখা শুরু করবে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে তারল্য সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকবিমুখতা তৈরি হলে তা পুরো অর্থনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেবে।
ব্যাংকিং সেবার ওপর নতুন ফি আরোপ এবং বিদ্যমান চার্জ বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। এই প্রস্তাবকে “আত্মঘাতী” ও “একতরফা মুনাফা বৃদ্ধির চেষ্টা” আখ্যা দিয়ে এটি বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। এতে বলা হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক ক্রান্তিকালে ব্যাংকিং সেবার ফি বাড়ানো হলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) অনেক বেড়ে যাবে, যা দেশীয় পণ্যের সক্ষমতা কমাবে। সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এটি কেবল ব্যাংকিং খাতের একতরফা মুনাফা লোটার কৌশল।
সঞ্চয় প্রবণতা ধ্বংসের আশঙ্কা: মাসে মাত্র ৩ বারের বেশি টাকা তুললে প্রতিবার ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ কাটা এবং ২৫ হাজার টাকার বেশি স্থিতিতে ৩০০ টাকা ফি নেওয়ার প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। চেম্বার সভাপতির মতে, এই অবাস্তব পদক্ষেপ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ আমানতকারীদের ব্যাংকে টাকা জমানোর প্রবণতাকেই পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।
বার্ষিক ১০% ফি বৃদ্ধির বিরোধিতা: পরিচালন ও প্রযুক্তিগত ব্যয়ের অজুহাতে প্রতি বছর ব্যাংকিং সেবার চার্জ সর্বোচ্চ ১০% হারে বাড়ানোর যে সুযোগ এবিবি চেয়েছে, সেটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক স্পষ্ট জানান, ব্যাংকগুলোর উচিত সাধারণ মানুষের পকেট না কেটে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ঋণ আদায় বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করা। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই জনস্বার্থবিরোধী প্রস্তাবটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
আশার কথা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রস্তাবের বিপরীতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই অবস্থানকে সাধুবাদ জানালেও গ্রাহকদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
গ্রাহক ও অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট দাবি—ব্যাংকিং সেবার চার্জ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার চেয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যাংকগুলোর উচিত গ্রাহকদের টাকা নির্বিঘ্নে তোলার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং সেবার মান উন্নত করা। ব্যাংক নির্বাহীদের এই পকেট কাটার প্রস্তাব অবিলম্বে চিরতরে খারিজ করে দেওয়া উচিত।