Home First Lead ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট পেশ করছে নতুন সরকার

ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট পেশ করছে নতুন সরকার

কেন্দ্রবিন্দুতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রেকর্ড মূল্যস্ফীতি এবং তীব্র কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’—এই মূল দর্শন ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম এই বাজেট।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর এটিই এই সরকারের প্রথম বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা, বেসরকারি বিনিয়োগের গতি ফেরানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে জনমনে স্বস্তি আনা।
ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি দিতে উৎসে করে বড় ছাড় উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষকে সরাসরি স্বস্তি দিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর ব্যাপকভাবে কমানোর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকা উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এই সুবিধার আওতায় আসবে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্য। যার মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, গবাদিপশু, মাছ ও হাঁস-মুরগিসহ অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মধ্য ও নিম্নবিত্তের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতেই এই জনমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে নীতিগত অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বড় অবকাঠামো নয়, জোর মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষায় বিগত বছরগুলোর প্রথাগত মেগা অবকাঠামো কেন্দ্রিক ধারা থেকে সরে এসে এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রায় ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা আসতে পারে। এছাড়া বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়িয়ে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় তহবিল দেশের তরুণ ও যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করতে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এবারের বাজেটে থাকছে বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা। প্রযুক্তিবান্ধব ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল তহবিল গঠন করা হচ্ছে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও আড়াই লাখ কোটির বিশাল ঘাটতি বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধান অংশ অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব থাকছে এনবিআর-এর ওপর।
রাজস্ব আয়ের বিশাল লক্ষ্যের পরও সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রধানত অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাতের ওপর ভরসা করছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বাকি ঘাটতি মেটানো হবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে।
শুল্ক-কর কাঠামোতে বদল ও ‘বাংলাবিজ’ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করছে সরকার। এছাড়া করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ইঙ্গিত রয়েছে। জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক ও উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব থাকলেও ধনিক শ্রেণির ওপর বাড়তি কর বা সারচার্জ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
মূল চ্যালেঞ্জ যেখানে অর্থনীতিবিদদের মতে, মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশে অবস্থান করছে, সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনাই হবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশাল বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং ও সঠিক মুদ্রানীতির সমন্বয় ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে তৈরি এই কল্যাণমুখী বাজেট দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে’ বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
Visit www.businesstoday24.com