শামসুল ইসলাম, ঢাকা: দীর্ঘ ৪৩ বছরের ঐতিহ্য আর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ পদে আসীন হলেন তার বড় ছেলে তারেক রহমান।
শুক্রবার রাতে গুলশানে দলের স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বিএনপির ‘চেয়ারম্যান’ পদে নির্বাচিত করা হয়।
মাতা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শূন্য হওয়া পদে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই পরিবর্তন আনা হলো। এর মধ্য দিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় পর নতুন শীর্ষ নেতা পেল দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দল।
তৃণমূল থেকে রাজপথ: যেভাবে গড়ে ওঠা: তারেক রহমানের রাজনীতিতে অভিষেক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে তার যাত্রা শুরু। তবে রাজপথে তার হাতেখড়ি হয়েছিল আরও আগে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মা বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে।
২০০২: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
২০০৯: পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
২০১৮: বেগম জিয়া কারারুদ্ধ হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কাঁধে নেন।
গত ১৭ বছর নির্বাসিত জীবনে থেকেও প্রযুক্তির সহায়তায় তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তিনি। ফ্যাসিস্ট সরকারের দমন-পীড়ন ও গুম-খুনের রাজনীতির মধ্যেও দলকে সুসংগঠিত রাখতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
ঐতিহাসিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত: শুক্রবার রাত ৯টায় তারেক রহমানের সভাপতিত্বেই স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে পূর্ণাঙ্গ ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন।
বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেন, “চেয়ারম্যান হলে আর ভারপ্রাপ্ত শব্দটির প্রয়োজন থাকে না। জাতীয় স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং তার সাফল্য কামনা করে দোয়া করেছে।”
উত্তরসূরি থেকে নেতা: এক দীর্ঘ সংগ্রাম
তারেক রহমান কেবল জিয়া পরিবারের সন্তান হিসেবেই নয়, বরং দলের সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কারের কারিগর হিসেবেও পরিচিত। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের যে ধারা তিনি শুরু করেছিলেন, তা তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মাইলফলক হয়ে আছে। ২০০৭ সালের জরুরি সরকারের সময় শারীরিক নির্যাতন এবং পরবর্তী দেড় দশকেরও বেশি সময় বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে।
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি বীরের বেশে দেশে ফেরেন। লক্ষ লক্ষ কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতিতে সেদিনই জানান দিয়েছিলেন, আগামীর বিএনপি হবে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও নির্বাচন ২০২৬:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএনপি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই এই রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান নিজে বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের উত্তরাধিকার বহন করা তারেক রহমানের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ—একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দলকে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।