Home Uncategorized নাবিক জীবন, সিডিসি কথা বলে-২

নাবিক জীবন, সিডিসি কথা বলে-২

‘বাংলার উপহার’ জাহাজে আমাদের প্রথম সমুদ্রযাত্রার আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটেছিল ১৯৭৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে সাগরের উত্তাল ঢেউ আর অচেনা সব বন্দরের জলহাওয়া মেখে কাটিয়েছিলাম সেই প্রথম ভয়েজ। তবে জাহাজি জীবনে এক যাত্রার শেষ মানেই তো আরেক যাত্রার নতুন পূর্বাভাস। বিশ্রামের বিন্দুমাত্র অবসর না দিয়ে শিপিংয়ের লগবুক অনুযায়ী ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকেই গণনা শুরু হয়ে গেল আমাদের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা।
এই দ্বিতীয় যাত্রার সূচনালগ্নে আমরা জাহাজ নিয়ে ভিড়লাম চালনা বন্দরে। স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বন্দরের উদ্দেশ্যে সেখানে আমাদের খোলে তোলা হলো বিপুল পরিমাণ সোনালী আঁশের পাটজাত পণ্য, বিশেষ করে সিবিসি বা কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ। জাহাজ বোঝাই করে চালনা ছেড়ে আমরা আবার মুখ ঘোরালাম আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে। সুয়েজ খালের নীল জলরাশি চিরে, ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিকের দীর্ঘ নোনাপথ ভেঙে টানা ৮,৩৪০ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে নির্বিঘ্নেই গিয়ে নোঙর ফেললাম ডান্ডি বন্দরে।
ডান্ডিতে সমস্ত পণ্য খালাস শেষ হতে না হতেই আমার শরীরে দেখা দিল এক চরম অস্বস্তি। তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্যে পেট কামড়ে একাকার, যাকে বলে কনস্টিপেশন। জাহাজে এই ধরনের শারীরিক জটিলতা নাবিকদের জন্য রীতিমতো এক দুঃসহ যাতনা। উপায় না দেখে বিষয়টি গিয়ে জানালাম আমাদের চিফ অফিসার মোখলেসুর রহমান সাহেবকে। তিনি তৎক্ষণাৎ বিষয়টি নিয়ে ক্যাপ্টেন বোদান কোরসাকের সঙ্গে কথা বললেন। সব শুনে ক্যাপ্টেন একগাল হেসে অভয় দিয়ে বললেন, চিন্তার কিছু নেই, সামনেই রটারড্যাম বন্দর; সেখানে পৌঁছালেই তোমার পেটের জন্য উপযুক্ত পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
রটারড্যামে জাহাজ ভিড়তেই ক্যাপ্টেনের নির্দেশে জাহাজের নিয়মিত রসদ বা প্রভিশনের সঙ্গে আমার জন্য বিশেষভাবে তোলা হলো বস্তাভর্তি কোয়েকার ওটস আর ভিটাবিক্সের প্যাকেট। বড়দের মুখে শুনেছিলাম, সাগরের শুকনো জীবনে এই আঁশযুক্ত খাবার পেটের জন্য নাকি অব্যর্থ মহৌষধ। জাহাজের বাবুর্চিকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যেন নিয়ম করে আমাকে এই ওটস আর ভিটাবিক্স রেঁধে দেওয়া হয়। সত্যি বলতে, নিয়মিত সেই খাবার খেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই শরীরটা বেশ চাঙ্গা আর হালকা হয়ে উঠল।
রটারড্যামের পাট চুকিয়ে আমাদের জাহাজ এবার গিয়ে ভিড়ল বেলজিয়ামের বিখ্যাত বন্দর অ্যান্টওয়ার্পে। সমুদ্রের নাবিক মহলে অ্যান্টওয়ার্পের এক বিশেষ খ্যাতি ছিল তার ‘নানিকা দোকান’-এর জন্য। দেশ-বিদেশের নাবিকেরা এই নানিকা দোকানে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ত হরেকরকম বিলেতি ইলেকট্রনিক্স আর শৌখিন সামগ্রী কেনার জন্য। প্রথম ভয়েজে তো হাত একেবারেই খালি ছিল, কিন্তু এবার পকেটে কিছুটা জমানো অর্থ থাকায় আমিও সেই নানিকা দোকানে গিয়ে মনের সুখে কেনাকাটায় মেতে উঠলাম। আমার বড় ভাইয়ের জন্য সেখান থেকে একটা ছোট ফ্রিজও কিনে ফেললাম, যা আসলে বড় ভাইয়ের স্ত্রীর বায়না মেটাতেই কেনা হয়েছিল। কেনাকাটা শেষে বাক্সপেটরা এনে তুললাম আমাদের ছোট কেবিনে।
আমাদের সেই বোঝাই কেবিন দেখে একদিন চিফ অফিসার মোখলেসুর রহমান সাহেব গম্ভীর মুখে এসে হাজির হলেন। চারপাশের স্তূপ করা জিনিসপত্রের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অসন্তোষের সুরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এখনো ক্যাডেট, এত জিনিসপত্র কিনে কেবিন ভরিয়ে ফেলছ কেন? আমি তখন কিছুটা আমতা আমতা করে কৈফিয়ত দিয়ে বললাম, স্যার, প্রথম ভয়েজে তো কিছুই কিনতে পারিনি, তাই এবার বড় ভাইয়ের জন্য একটু লোড-টোর্ড করতেছি। মোখলেস সাহেব তখন স্নেহের পরশে কিছুটা শাসন মিশিয়ে এক গভীর শিক্ষণীয় কথা বললেন। তিনি বললেন, এই বয়েসে তোমাদের এখন মন দিয়ে বই কেনার কথা, জ্ঞান অর্জন করার কথা; তা না করে তোমরা এখনই ফ্রিজ, রেডিও আর টেলিভিশনের মতো পার্থিব বস্তুর পেছনে পয়সা ঢালতে শুরু করেছ! সেই উপদেশ আজও আমার কানে বাজে।
অ্যান্টওয়ার্প থেকে নানিকা দোকানের স্মৃতি আর কেনাকাটার ডালি নিয়ে আমাদের জাহাজ মুখ ঘোরাল বাল্টিক সাগরের কোলে, পোল্যান্ডের একটি বন্দরের পানে। এই পোল্যান্ডই ছিল আমাদের ক্যাপ্টেন বোদান কোরসাকের নিজের দেশ, তাঁর চেনা মাটির গন্ধমাখা বন্দর। নিজ দেশে ফিরে ক্যাপ্টেনের মনটা যেন খুশিতে একেবারে ডগমগ করছিল। বিশেষ করে আমাদের মতো দুই নবীন ক্যাডেটকে তিনি যেন নিজের সন্তানের মতোই আপন করে নিলেন। একসময় জাহাজ পরিষ্কারের কাজে টয়লেট ধোয়ানো নিয়ে যে কড়া অনুশাসন তিনি দেখিয়েছিলেন, নিজের মাটিতে পা রেখে সেই পুরোনো শাসনের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি পরম মমতায় আমাদের তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবনে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁর পরিবারের আন্তরিক আতিথেয়তা আর পোলিশ সংস্কৃতির উষ্ণ ছোঁয়া আজও আমার হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
পোল্যান্ডের বরফশীতল বন্দরকে পেছনে ফেলে এবার আমাদের দীর্ঘ ফিরতি সমুদ্রযাত্রার সূচনা হলো। সাগরের বুকে একটানা ৭,৯৮০ নটিক্যাল মাইল জলপথ অতিক্রম করে আমরা অবশেষে এসে পৌঁছালাম ভারতের মাদ্রাজ বন্দরে। কিন্তু মাদ্রাজে পা রাখতেই এক অপ্রত্যাশিত প্রশাসনিক ধাক্কা অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শিপিং কর্পোরেশন থেকে জরুরি নির্দেশে আমাদের চিফ অফিসার মোখলেসুর রহমান সাহেবকে সেখান থেকেই বদলি করে বিমানে সরাসরি চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। জাহাজের পুরোনো অভিভাবক চলে যাওয়ায় আমরা কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়লাম।
তাঁর জায়গায় নতুন চিফ অফিসার হিসেবে এসে যোগ দিলেন এক বয়োবৃদ্ধ আমেরিকান ভদ্রলোক, যিনি অতীতে মার্কিন নৌবহরে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু জাহাজে এসে উঠতেই তাঁর হাবভাব ও চালচলন দেখে আমরা তাজ্জব বনে গেলাম। জাহাজের দৈনন্দিন পরিচালনা কিংবা বাণিজ্যিক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কলাকৌশল সম্পর্কে তাঁর বাস্তব কোনো ধারণাই যেন ছিল না। তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সিনিয়র অফিসারের প্রচণ্ড সংকট ছিল বলেই হয়তো শিপিং কর্তৃপক্ষ এমন একজনকে হুট করে নিয়োগ দিয়েছিল।
আমেরিকান ভদ্রলোক তাঁর নিজের অদক্ষতা খুব দ্রুতই আঁচ করতে পারলেন এবং জাহাজের পুরো নিয়ন্ত্রণ কার্যত আমাদের মতো নবীশ ক্যাডেটদের ওপরই ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। ক্যাডেট হিসেবে জাহাজের পাটাতন থেকে শুরু করে কার্গো হোল্ডের অন্ধকার কুঠুরি পর্যন্ত সর্বত্র আমাদের সর্বক্ষণিক বিচরণ ছিল। ওদিকে সেকেন্ড আর থার্ড অফিসাররা ব্যস্ত থাকতেন চার্ট রুমের দিকনির্ণয় ও নেভিগেশনের জটিল হিসেবে। ফলে মালামাল খালাসের পুরো কাজের তদারকি আর নির্ভরতা এসে পড়ল আমাদের ওপরই। তবে সৌভাগ্যবশত কাজটা খুব একটা কঠিন ছিল না; বন্দরে স্বাভাবিক নিয়মেই মালামাল একে একে নেমে যাচ্ছিল।
ঠিক এই সময়েই ভারতে মুক্তি পেয়েছিল অমিতাভ বচ্চন ও ধর্মেন্দ্রর সাড়া জাগানো কালজয়ী সিনেমা ‘শোলে’। মাদ্রাজ শহরে তখন চারদিকে কেবল ‘শোলে’র উন্মাদনা। আমরা কয়েকবার দল বেঁধে সিনেমা হলে টিকিট কাটতে গিয়েও নিরাশ হয়ে ফিরলাম; প্রতিবারই হাউজফুল আর মানুষের উপচে পড়া ভিড় ঠেলে টিকিট পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সিনেমার নেশা তখন আমাদের মাথায় জেঁকে বসেছে।
একদিন জাহাজে ফিরে আমি আমাদের সেই আমেরিকান চিফ অফিসারকে গিয়ে ধরলাম। বললাম, স্যার, শহরে এমন এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি চলছে যা দেখতে না পারলে আমাদের মাদ্রাজ যাত্রাই বৃথা হয়ে যাবে; আপনি যেভাবে হোক আমাদের টিকিটের একটু ব্যবস্থা করে দিন! আমাদের আবদার শুনে ভদ্রলোক মুচকি হাসলেন। তিনি সোজা চলে গেলেন মাদ্রাজে অবস্থিত আমেরিকান কনস্যুলেটে। নিজের দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল ও বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে তিনি আমাদের জন্য ‘শোলে’ সিনেমার নিশ্চিত টিকিটের ব্যবস্থা করে আনলেন। অচেনা এক আমেরিকান অফিসারের এমন অদ্ভুত ও আন্তরিক সহযোগিতায় বড় পর্দায় সেই ঐতিহাসিক সিনেমা দেখার রোমাঞ্চ আমাদের তরুণ মনে এক অবিস্মরণীয় দাগ কেটে দিয়েছিল।
মাদ্রাজ বন্দরের সমস্ত কাজ ও খালাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা আবার জাহাজ ভাসিয়ে দিলাম ঘরের টানে। বঙ্গোপসাগরের পরিচিত বুক চিরে অবশেষে আমাদের জাহাজ এসে ভিড়ল চেনা চট্টগ্রাম বন্দরে। এর মাধ্যমেই পর্দা নামল ‘বাংলার উপহার’ জাহাজে কাটানো আমাদের জীবনের বৈচিত্র্যময়, আবেগঘন ও শিক্ষণীয় দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার।
সাগরের তাণ্ডব, করাচির স্মৃতি ও সমুদ্রজীবনের এক অনন্য অধ্যায়
মেরিন একাডেমির দিনগুলো শেষ করে জীবনের প্রথম জাহাজ ‘বাংলার উপহার’-এ ডেক ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। ১৫ হাজার টনের সেই বিশাল জাহাজে সমুদ্রের সঙ্গে প্রথম সখ্য। গ্রেড-ওয়ান ক্যাডেট, ২৭৫ টাকা ইনক্রিমেন্টও হয়েছে—সব মিলিয়ে এক নতুন স্বপ্ন। কিন্তু ‘বাংলার উপহার’ জাহাজে দুই ভয়েজ করে যখন বিএসসি-র ‘এমভি ঢাকা’ জাহাজে গিয়ে উঠলাম, প্রথম দর্শনেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!
কোথায় ১৫ হাজার টনের দানবীয় জাহাজ, আর কোথায় এই ১২০০ টনের পিচ্চি জাহাজ! মনে হলো এক বিশাল প্রাসাদ থেকে এসে যেন একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরে উঠলাম। কিন্তু এই ছোট জাহাজটাই আমাকে সমুদ্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি দিতে যাচ্ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ যাত্রা শুরু করবে চালনা হয়ে করাচির উদ্দেশ্যে। জাহাজে বোঝাই করা হলো সিবিসি কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ আর ঝাড়ু। চালনা পৌঁছানোর পর সেখান থেকে তোলা হলো প্রচুর বাঁশ—তৎকালীন সময়ে যা পাকিস্তানে রপ্তানি করা হতো।
জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন জনাব কুদ্দুস। জাদরেল এবং পাকিস্তান আমলের তুখোড় ভেটেরান এক ক্যাপ্টেন। চিফ অফিসার ছিলেন মি. গোমেজ। আর সেকেন্ড অফিসার ছিলেন একজন সিনিয়র মেরিনার, তবে ওনার কোনো প্রফেশনাল সার্টিফিকেট ছিল না। আমিও মোটামুটি সিনিয়র ক্যাডেট, তাই আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো থার্ড অফিসার হিসেবে। ছোট জাহাজে একা একা দায়িত্ব নিয়ে এটাই আমার প্রথম ডিউটি। ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম আর ৪ ঘণ্টা ডিউটির নিয়ম। ক্যাপ্টেন সাহেব চিফ অফিসারকে সাফ জানিয়ে দিলেন, “ওর ওপর কোনো কাজের চাপ দেবে না, ও সরাসরি আমার সুপারভিশনে থাকবে।”
জাহাজ চালনা ছেড়ে সাগরে নামল। প্রথম রাতে ৮টার দিকে ক্যাপ্টেন কুদ্দুস আমাকে ব্রিজে ডেকে বললেন, “আমি নিচে শুতে যাচ্ছি। সমুদ্রের সামনের দিকে যদি কোনো আলো দেখো, তাহলে এই যন্ত্রে ফু দিয়ে আমাকে সতর্ক করবে।” কত দূরে বাতি দেখলে সংকেত দিতে হবে, তার একটা ধারণাও উনি বুঝিয়ে দিলেন। যন্ত্রে ফু দিলে অদ্ভুত এক ধরনের তীক্ষ্ণ শব্দ হতো।
ক্যাপ্টেন নিচে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ আমি জাহাজের পেছনে অনেক দূরে একটা আলো দেখতে পেলাম। দায়িত্ব সচেতন ক্যাডেট হিসেবে কালবিলম্ব না করে সোজা ফু দিলাম যন্ত্রে। শব্দ শুনেই জাদরেল ক্যাপ্টেন কুদ্দুস হন্তদন্ত হয়ে, একেবারে আতংকগ্রস্ত অবস্থায় লুঙ্গি পরা অবস্থাতেই দৌড়ে ব্রিজে চলে এলেন!
— “কোথায়? কোথায় লাইট?” উনি হাঁপাচ্ছিলেন। আমি খুব উৎসাহ নিয়ে জাহাজের পেছনের আলোটা দেখিয়ে দিলাম।
ক্যাপ্টেন আমার দিকে তাকিয়ে এক বিষণ্ন বিরক্তি নিয়ে বললেন, “দ্যৎ! পেছনে নয়, জাহাজের সামনে বাতি দেখলে সতর্ক করবে! পেছনে আলো দেখলে ফু দেওয়ার কিছু নেই।”
কথাটা বলেই উনি আবার নিচে চলে গেলেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাত ১২টা পর্যন্ত উনি আর ব্রিজে ফিরে আসেননি। ওই একটা ছোট ঘটনাতেই উনি বুঝে গিয়েছিলেন যে ছেলেটা সতর্ক আছে এবং একা একা দায়িত্ব সামলানোর মতো ম্যাচিউরড হয়ে উঠেছে। মাত্র এক বছরের মাথায় আমার ভেতরে এই পরিবর্তন দেখে উনি আশ্বস্ত হয়েছিলেন। এরপর সেকেন্ড অফিসার এলে ওনাকে ব্রিজের চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
বঙ্গোপসাগরের ভয়াল তাণ্ডব ও বোতলের চিঠি
পরদিন ঠিক দুপুর ১২টায় রেডিও মেসেজ আসলো—আমাদের ঠিক সামনে নাকি এক বিশাল সামুদ্রিক ঝড় অপেক্ষা করছে! সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে এমন ভয়াবহ তুফান ওঠে না, কিন্তু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বোঝা দায়।
ক্যাপ্টেন কুদ্দুস নিজে ব্রিজে এসে দাঁড়িয়ে দূরবিন দিয়ে দিগন্ত পর্যবেক্ষণ করছিলেন। যে গতিতে আর যেভাবে তুফানটা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল, তা এড়ানোর কোনো সুযোগই আমাদের ছিল না। ডানে, বামে বা পেছনে যাওয়ার কোনো পথ নেই—জাহাজকে সরাসরি এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা তখন এক চরম মহাবিপদের মুখে!
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল বঙ্গোপসাগরের সেই বিখ্যাত তাণ্ডব। ঝড়ের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ১২০০ টনের ছোট জাহাজটি ঢেউয়ের চূড়ায় উঠছিল আর পরক্ষণেই যেন পাতালগর্ভে নেমে যাচ্ছিল। আমরা সবাই একপ্রকার জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে চরম হতাশায় বসে রইলাম।
এরই মধ্যে আমাদের জাহাজের ইলেকট্রিক্যাল অফিসার, যাকে আমরা সবাই ‘বাত্তি সাব’ বলে ডাকতাম, সেই হারুন ভাই এসে কাতর স্বরে বললেন, “ভাই, আমি তো মাত্র বিয়ে করে আসলাম! আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না।” আমি একটু বিস্ময় আর কৌতুক মিশিয়ে বললাম, “কী করবেন হারুন ভাই? সাগরে লাফ দেবেন নাকি?” উনি গম্ভীর মুখে বললেন, “না, লাফ দেব না। একটা বোতলে লিখে দিই—’আমি তোমাকে ভালোবাসি’। তারপর সাগরে ভাসিয়ে দিই।”
কথা শেষ করেই উনি সত্যিই একটা কাগজে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভালোবাসা লিখে কাচের বোতলে ভরে সাগরে ভাসিয়ে দিলেন! আমরা অবাক হয়ে দৃশ্যটি দেখলাম। কারণ উনি সত্যি বিশ্বাস করেছিলেন যে এই তুফান থেকে বেঁচে ফেরা অসম্ভব।
কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও আমি ক্যাপ্টেন কুদ্দুসের অসাধারণ সাহসিকতা দেখেছি। পাকিস্তান আমলের পোড় খাওয়া এই ক্যাপ্টেনের চোখেমুখে কোনো ভয়ের ছাপ ছিল না, কোনো অনাবশ্যক ভাবাবেগ ছিল না। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় উনি জাহাজ সামলে যাচ্ছিলেন। জাদরেল গলায় শুধু বললেন, “পানি একবার এই পাশ থেকে ওই পাশে যাচ্ছে। জাহাজে বাঁধাই করা বাঁশগুলোর যে কী অবস্থা, আল্লাহই জানেন!”
তুফানের তীব্রতায় চিফ অফিসার পর্যন্ত ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। প্রচণ্ড রোলিংয়ের কারণে জাহাজ একপাশে এত বেশি কাত হয়ে যাচ্ছিল যে ব্রিজের এক কোণা থেকে অন্য কোণায় টিকতে না পেরে আমরা গড়িয়ে দৌড় দিতাম।
পরদিন সকালে যখন আমি ব্রিজে ডিউটিতে ছিলাম, হঠাৎ দেখলাম দূর দিয়ে মাদ্রাজ (চেন্নাই) থেকে সিঙ্গাপুরের দিকে একটা বিশাল কন্টেইনার বা কার্গো জাহাজ যাচ্ছে। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টনের দানবীয় জাহাজ, অথচ এই ঝড়ে সেটিও দুলছিল! বঙ্গোপসাগরের রুট পার হওয়ার সময় তারা আমাদের এই ক্ষুদ্র জাহাজটিকে সাগরের মাঝে তুফানের সঙ্গে লড়াই করতে দেখে চমকে গেল।
ভিএইচএফ (VHF) রেডিওতে সংযোগ হতেই তাদের দিক থেকে ভেসে এলো প্রশ্ন: “এমভি ঢাকা, হোয়াট আর ইউ ডুইং হিয়ার? আর ইউ ফিশিং?” (এমভি ঢাকা, তোমরা এই ঝড়ের মধ্যে এখানে কী করছ? মাছ ধরছ নাকি?) আমরা জবাব দিলাম, “না, আমরা মাছ ধরছি না, আমরা করাচি যাচ্ছি।” ওপাশ থেকে বিস্ময় নিয়ে উত্তর এলো: “হাউ ড্যার ইউ আর! তোমাদের এত সাহস?”
জাহাজটার নাম ছিল ‘চেন্নাই সাদনাই’। ৫০-৬০ হাজার টনের একটা জাহাজের নাবিকদের এই বিস্ময় দেখে আমরা মনে মনে বললাম, “আমাদের কোনো বাড়তি সাহস নেই ভাই, বন্দর ছাড়ার পর এই তুফানের খপ্পরে পড়েছি, এখন পিছু হটার পথ নেই!”
জাহাজের অবস্থা দেখে আমাদের কার্পেন্টার হাতজোড় করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। সে কসম খেয়ে বলল, “আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে যদি যেকোনো একটা বন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়, আমি আর এই জাহাজে থাকব না! একবারে নেমে যাব!” ক্যাপ্টেন সাব গম্ভীর মুখে সবার সব কান্নাকাটি ও আকুতি শুনলেন, কিন্তু নিজের নজর রাখলেন স্টিয়ারিং আর সাগরের ঢেউয়ে।
১১ দিনের সংগ্রাম ও কলম্বো বিরতি
ঝড় কিছুটা কমলেও জাহাজে নতুন বিপদ দেখা দিল। ইঞ্জিনে বড় ধরনের লিক তৈরি হয়েছে, পানি গলগল করে ঢুকছে। ক্যাপ্টেন কুদ্দুস আবার ভিএইচএফে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানালেন যে, এই অবস্থায় করাচি পর্যন্ত যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রেডিও কন্ট্রোল থেকে নির্দেশ এলো, “ঠিক আছে, তোমরা নিকটস্থ কলম্বো বন্দরে গিয়ে আশ্রয় নাও এবং মেরামত করো।”
সাধারণত চট্টগ্রাম থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো যেতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ দিন সময় লাগে। এমভি ঢাকা জাহাজের মতো ধীরগতির জাহাজের জন্যও সর্বোচ্চ ৪ দিন লাগার কথা। কিন্তু ভয়াবহ আবহাওয়া, সমুদ্রের উল্টো স্রোত আর ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে এগোতে আর পেছাতে গিয়ে আমাদের কলম্বো পৌঁছাতে সময় লাগল পুরো ১১ দিন!
১১ দিনের মাথায় যখন আমরা কলম্বো বন্দরে পৌঁছালাম, তখন বন্দরের পাইলট আমাদের জাহাজের আকার আর আমাদের টিকে থাকার গল্প শুনে হেসে ফেললেন। প্রশংসার সুরে বললেন, “তোমরা আসলেই দারুণ সাহসী! এই বিশাল ঝড়ে এত ছোট জাহাজ নিয়ে টিকে থাকা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।”
কলম্বোতে জাহাজ নোঙর করার পর মেরামতের কাজ শুরু হলো। এই ফাঁকে চিফ অফিসার আমাদের সেই ভিতু কার্পেন্টারকে ডেকে মজা করে বললেন, “কী হে কার্পেন্টার? তুমি না বলছিলে কলম্বো পৌঁছালে জাহাজ থেকে একবারে নেমে যাবে? এখন নামবা?” কার্পেন্টার লজ্জিত হেসে বলল, “না স্যার, এখন তো পরিবেশ ভালো লাগে! আর নামব না।”
ঝড় কেটে গেছে, সাগরের রূপ বদলে গেছে, তাই ভয়ের বদলে আবার সমুদ্রের প্রতি ভালোবাসা ফিরে এসেছে। এরপর  কয়েকদিন শহর ঘুরে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা বেশ সতেজ হয়ে উঠলাম।
করাচি বন্দর, ‘রাজকীয় সংবর্ধনা’র আশার গুড়ে বালি
কলম্বোতে রিপেয়ারিং শেষ করে এবার আমাদের যাত্রা করাচির উদ্দেশ্যে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এটাই ছিল কোনো বাংলাদেশি জাহাজের প্রথম পাকিস্তান যাত্রা। এর কিছুদিন আগেই পাকিস্তানের একটা পতাকাবাহী জাহাজ বাংলাদেশে এসেছিল, আর আমাদের দেশ থেকে সেটাকে বেশ রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। ক্যাপ্টেন কুদ্দুসের ধারণা ছিল, বাংলাদেশি প্রথম জাহাজ হিসেবে ‘এমভি ঢাকা’ যখন করাচি পৌঁছাবে, তখন পাকিস্তান বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদেরও অনুরূপ কোনো রাজকীয় সংবর্ধনা বা গান স্যালুট দেবে!
ক্যাপ্টেন কুদ্দুস আগে থেকেই সবাইকে সতর্ক করে বললেন, “সবাই একদম দামি পোশাক-আশাক পইরা ফিটফাট থাকবা। আমরা বাংলাদেশের প্রথম জাহাজ হিসেবে যাচ্ছি, করাচিতে আমাদের বিশাল ওয়েলকাম জানানো হবে।”
খাওয়ার টেবিলে প্রতিদিন এই নিয়ে আলোচনা চলত। আমরা সবাই নতুন পোশাক ইস্ত্রি করে প্রস্তুত হয়ে রইলাম। জাহাজ করাচি বন্দরের বহির্নোঙরে (Outer Anchorage) গিয়ে পৌঁছল। রেডিও কন্ট্রোলে আমরা বার্তা পাঠালাম।
কিন্তু ওপাশ থেকে রুটিন মাফিক উত্তর এলো: তোমরা নোঙর ফেলে অপেক্ষা কর।
আমরা প্রথম দিন অপেক্ষা করলাম। ভাবলাম, হয়তো অভ্যর্থনার প্রস্তুতি চলছে। পরদিন আবার ভিএইচএফে জিজ্ঞেস করা হলো, “আমরা কখন বন্দরে ভিড়তে পারব?” উত্তর এলো একদম রুক্ষ ও অনিশ্চিত: “ইটস আনসার্টেন! কখন তোমাদের জাহাজ ভিড়তে পারবে, তা আপাতত বলা যাচ্ছে না।”
ক্যাপ্টেন সাহেবের মুখটা এক লহমায় ছোট হয়ে গেল। কোথায় গান স্যালুট, আর কোথায় রাজকীয় সংবর্ধনা! টানা ১০ থেকে ১২ দিন আমাদের করাচির আউটার এঙ্করে অলসভাবে ভাসিয়ে রাখা হলো। সাগরে ভাসতে ভাসতে আমাদের রাজকীয় পোশাকের ইস্ত্রি ভেঙে গেল, কিন্তু কোনো সংবর্ধনার দেখা মিলল না। আসলে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ এসবে কোনো পাত্তাই দেয়নি! আমরা নিজ থেকে আবেগ দেখিয়ে তাদের জাহাজকে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম, কিন্তু তাদের মধ্যে সেই সৌজন্য ছিল না।
অবশেষে বহু দিন পর সাধারণ একটা জাহাজের মতোই আমাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো।
বাঁশের ভেতর সাপ ও ড্রাই ডকিংয়ের ভোগান্তি
করাচি বন্দরে জাহাজ ভিড়ানোর পর শুরু হলো কার্গো আনলোডিং। চালনা থেকে যে বাঁশগুলো লোড করা হয়েছিল, সেগুলো নামানোর কাজ শুরু করলেন স্থানীয় পাকিস্তানি কুলিরা(স্টিভিডোর)।
হঠাৎ এক রাতে জাহাজের ডেক থেকে প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি! “সাপ! সাপ!”
বাঁশের ভেতরে করে বাংলাদেশ থেকে চালনার জ্যান্ত সাপ চলে গেছে করাচিতে! কার্গো খালি করার সময় বাঁশের ভেতর থেকে থোকা থোকা সাপ বের হতে শুরু করেছে। সাপ দেখে পাকিস্তানি কুলিরা সব কাজ ফেলে রেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। সাফ জানিয়ে দিল—সাপ না মারা পর্যন্ত তারা কোনো কাজ করবে না!
পরে বিশেষ লোক ডেকে আনা হলো। তারা পুরো জাহাজে ওষুধ স্প্রে করে, সাপ ধরে ও মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনল।
এই ঝামেলা শেষ হতে না হতেই বিএসসি (বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন)-র পক্ষ থেকে নতুন বার্তা এলো—জাহাজকে নাকি করাচিতেই ‘ড্রাই ডকিং’ করতে হবে! আবার জাহাজকে বের করে আউটার এঙ্করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। নির্দেশ—”ড্রাই ডক খালি হলে ঢুকবে।”
যে ভয়েজটি চট্টগ্রাম থেকে করাচি গিয়ে মালামাল খালাস করে সর্বোচ্চ ২০ দিন বা ১ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা, সেই সাধারণ ভয়েজটি শেষ হতে সময় লেগে গেল ৩ মাসেরও বেশি!
করাচিওয়ালারা কাজে চরম ঢিলা ছিল। কেবল এই ছোট জাহাজটার ড্রাই ডকিং করতেই তারা ১ মাস সময় লাগিয়ে দিল। তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, বিএসসি-র ম্যানেজমেন্ট কতটা দুর্বল ও অপেশাদার ছিল। এই তুচ্ছ ড্রাই ডকিংয়ের কাজটা করাচিতে চড়া দামে না করিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এনেও খুব সহজে করা যেত।
তবে এই অলস সময়ের একটা ভালো দিকও ছিল। ড্রাই ডকিং চলাকালীন প্রতিদিন আমরা করাচি শহরে ঘুরতে যেতাম। শহর হিসেবে করাচি দারুণ ছিল, বিশেষ করে সেখানকার কাবাব ছিল এক কথায় অসাধারণ! সেই সময়ে করাচিতে পাকিস্তান বনাম নিউজিল্যান্ডের একটি টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। বিদেশে বসে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে গিয়ে টানটান উত্তেজনার টেস্ট ম্যাচটি উপভোগ করলাম—যা ছিল বিদেশে গিয়ে মাঠে বসে আমার প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা।
ড্রাই ডক শেষ করে আমরা করাচি থেকে কিছু মানসম্পন্ন ফিনিশড প্রোডাক্ট ও ওষুধ লোড করলাম। ফেরার পথে আর কোনো ঝড়-ঝাপটা বা দুর্ঘটনা ঘটেনি। মাত্র ৯ দিনের একটানা শান্ত যাত্রায় আমরা সুস্থভাবে চট্টগ্রামে ফিরে আসলাম।
স্মৃতিতে ‘এমভি ঢাকা‘
‘এমভি ঢাকা’ জাহাজে আমার প্রথম এই ভয়েজটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আর শেষ হয় ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিএসসি-র ছোট জাহাজে একটা বড় সমস্যা ছিল—এখানে সি-টাইম (Sea Time) পুরো পাওয়া যেত না। অন্য জাহাজে ১ বছর চাকরি করলে ১ বছরের সি-টাইম গণনা করা হতো, কিন্তু এমভি ঢাকা-র মতো ছোট জাহাজে পাওয়া যেত ‘টু-থার্ড’ (২/৩) সময়। অর্থাৎ ১২ মাস জাহাজে থাকলে সি-টাইম মিলত মাত্র ৯ মাসের। সমুদ্র পরীক্ষায় বসার জন্য ৩ বছর ৯ মাস সি-টাইম তোলার জন্য আমাদের বেশ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
চট্টগ্রামে ফেরার পর ‘এমভি ঢাকা’-তেই শুরু হলো আমার দ্বিতীয় ভয়েজ। তবে এবার আর করাচি নয়, এবার আমাদের গন্তব্য ভারতের কলকাতা বন্দর।
ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ১৯৭৬ সালের ১১ই অক্টোবর। শুরু হলো আমাদের ‘এমভি ঢাকা’ জাহাজের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রা। এমভি ঢাকা ছিল উপকূলীয় নৌপথের বেশ ছোটখাটো একটি জলযান, কিন্তু ছোট জাহাজের একেকটি যাত্রায় অভিজ্ঞতার পরিধি যে কত বড় হতে পারে, তা এই ভয়েজেই নতুন করে উপলব্ধি করেছিলাম।
যাত্রার শুরুতে আমরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে চললাম চালনা পোর্টের দিকে। চালনায় তখন জোয়ার-ভাটার নিবিড় টানাপোড়েন আর বাদাবনের নোনা বাতাসের গন্ধ। সেখানে আমাদের ছোট জাহাজের খোলে কিছু মালামাল তোলা হলো, যা নিয়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারিত ছিল পশ্চিমের মহানগরী কলকাতায়। চালনা ছেড়ে নদী আর খাড়ি পেরিয়ে অবশেষে আমরা গিয়ে নোঙর ফেললাম গঙ্গার তীরে, কলকাতার খিদিরপুর ডকে।
কলকাতা বন্দরে তখন রকমারি পণ্যের গমগম পরিবেশ। বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানে তোলা হচ্ছিল নানা জাতের বিচিত্র পণ্যসামগ্রী। ঢাকা জাহাজের সর্বসাকুল্যে পণ্য পরিবহনের ধারণক্ষমতা ছিল মোটে ১৯০০ টন। এত বড় মহানগরে এইটুকু পণ্য বোঝাই করা এমন কোনো বড় কাজ ছিল না, কিন্তু সেখানকার জেটির ধীরগতি, শ্রমিকদের ঢিলেঢালা ভাব আর ডকের জটিল আনুষ্ঠানিকতায় সেই সামান্য ১৯০০ টন কার্গো জাহাজে তুলতেই আমাদের টানা দশ-বারোটি দিন লেগে গেল।
এই অলস অপেক্ষার মাঝেই জাহাজের প্রশাসনিক নেতৃত্বে এলো এক বড় পরিবর্তন। ঢাকা জাহাজে নতুন কমাণ্ডার হিসেবে যোগ দিলেন এক ভারতীয় ক্যাপ্টেন। তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করতে একা আসেননি, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর গোটা পরিবারকে। এত বড় আন্তর্জাতিক বন্দরে এমন একটি ছোট উপকূলীয় কার্গো জাহাজ কীভাবে সমুদ্র চষে বেড়ায়, তা দেখানোর জন্য তাঁর কিশোরী মেয়ের দলবল আর বান্ধবীদেরও জাহাজে বেড়াতে নিয়ে এসেছিলেন।
জাহাজের পাটাতনে তখন নবীন অতিথিদের পদচারণা আর হাসির কলরব। আমি তখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্যাডেট হলেও জাহাজের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনেই আমাকে থার্ড অফিসারের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছিল। নতুন ভারতীয় ক্যাপ্টেন আমাকে ডেকে বেশ স্নেহের সুরেই বললেন, “তুমি তো এই জাহাজের প্রতিটি কোনা চেনো, ওদেরকে একটু ভালো করে পুরো জাহাজটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দাও।” আমি হাসিমুখে তাঁর অনুরোধ মেনে নিলাম এবং সেই তরুণী দলকে জাহাজের ব্রিজ, ইঞ্জিন রুম, নেভিগেশন চার্ট টেবিল ও ডেক ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দিলাম।
জাহাজ দর্শন শেষে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে তারা সবাই এসে বসল আমার ছোট কেবিনের ভেতর। গল্পগুজবের একপর্যায়ে তাদের একজনের চোখ পড়ল আমার পড়ার টেবিলে রাখা বাংলাদেশের সদ্য প্রকাশিত জনপ্রিয় সাহিত্য ও রাজনৈতিক পত্রিকা ‘বিচিত্রা’র ওপর। আগ্রহ নিয়ে সে পত্রিকাটি হাতে তুলে নিল। পাতার পর পাতা চমৎকার প্রচ্ছদ আর বাংলা লেখার বিন্যাস উল্টেপাল্টে দেখে তাদের চোখ কপালে উঠল। খানিকটা বিস্ময় আর অতি-আভিজাত্য মেশানো কণ্ঠে এক তরুণী বলে উঠল, “ওমা! আপনারা বাংলায় ম্যাগাজিন পড়েন?”
তার কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা যেন ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠল। বুকে এসে লাগল গভীর এক নীরব চাবুকের ঘা। আমি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলাম, “অবশ্যই আমরা বাংলায় পড়ব। আমরা বাঙালি, মাতৃভাষা আমাদের গর্ব; নিজেদের ভাষায় সাময়িকী না পড়লে আর কী পড়ব?” তারপর কৌতুহলবশত তাদেরই উল্টো প্রশ্ন করলাম, “কলকাতার মানুষ হয়ে তোমরা তাহলে কী ভাষায় সাহিত্যচর্চা করো? তোমরা কি ইংরেজিতে পড়ো?”
তাদের মুখ থেকে যে উত্তরটি এলো, তা আমাকে হতবাক করে দিয়েছিল। কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই তারা বলল, “না, আমরা তো হিন্দি পড়ি।”
সেই উত্তরটি আমার তরুণ মনে দারুণ এক দাগ কেটেছিল। যে কলকাতা একসময় বাংলা ভাষা, সাহিত্য, রবীন্দ্র-নজরুল আর সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর ছিল, সেই কলকাতার পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালি কন্যারা মাতৃভাষাকে একপাশে সরিয়ে রেখে অনায়াসে ভিনদেশি এক ভাষার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে, তা দেখে বুকের ভেতর এক ধরণের হাহাকার জেগে উঠেছিল। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিলাম, তোমরা তবে আসলেই নিজেদের শিকড় ভুলে যাচ্ছ! সেই ১৯৭৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরের পদধ্বনি আজ এত বছর পরেও যেন স্পষ্ট মিলিয়ে নেওয়া যায়।
অবশেষে মালবোঝাইয়ের দীর্ঘ পালা চুকিয়ে ঢাকা জাহাজ গঙ্গাবক্ষ ছেড়ে ফিরতি পথে ভেসে পড়ল বঙ্গোপসাগরের নীল জলে। শান্ত সমুদ্রে যাত্রা করে আমরা আবার এসে ভিড়লাম ঘরের আঙিনা চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দর জেটিতে নোঙর ফেলার পর সমস্ত পণ্য খালাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। আর সেই সাথে ১৯৭৭ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটল ‘এমভি ঢাকা’ জাহাজের সঙ্গে কাটানো আমার বর্ণিল দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার।
আফ্রিকার রাত ও নাইজেরীয় মায়াজাল: মনটানার ডেক থেকে
এমভি আরামবি জাহাজের পাটাতনে দাঁড়িয়ে যখন শেষবারের মতো সাগরের নোনা হাওয়া বুক ভরে নিলাম, ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ১৯৮০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি। দূর প্রাচ্যের দেশ তাইওয়ানের এক বন্দরে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা নামল এই জাহাজের সঙ্গে আমার দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার। ভেবেছিলাম এবার হয়তো কিছুদিন জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত মিলবে, কিন্তু নিয়তির হিসেব ছিল অন্যরকম।
জাহাজের কাজ চুকিয়ে নামতেই আরামবির মালিকপক্ষ—মূলত ইসরায়েলভিত্তিক এক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি—আমার সামনে নতুন এক প্রস্তাব রাখল। তারা সরাসরি জানিয়ে দিল, তাদের একটি তেলবাহী বিশালাকার ট্যাংকারে সেকেন্ড অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে এবং সেখানে তারা আমাকেই চায়। আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে রাজি হয়ে গেলাম।
এর পেছনে একটা বড় তাড়না ছিল। ততদিনে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন থেকে আমার দেশের ঠিকানায় চিঠি পৌঁছে গেছে যে আমি সেকেন্ড মেট পাস করেছি, এবার যেন অবিলম্বে সরকারি জাহাজে যোগদান করি। কিন্তু আমি সেই ডাকে তখন সাড়া দিতে পারিনি। ইংল্যান্ডে সেকেন্ড মেটের কঠিন পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমার সমস্ত সঞ্চয় নিঃশেষ হয়েছিল, কাঁধে জমেছিল বিপুল খরচের বোঝা। সেই দেনা শোধ করতে এবং নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে তখন বিদেশি জাহাজের আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক আমার জন্য বড় বেশি জরুরি ছিল।
কিন্তু বিপত্তি বাধল যাত্রার পথ নির্ধারণ করতে গিয়ে। কোম্পানি চাইল আমাকে তাইওয়ান থেকে লন্ডন হয়ে সরাসরি নিউ ইয়র্কে পাঠাতে। কিন্তু গোল বাঁধাল আমার পাসপোর্ট আর সিডিসি। তখনকার বাংলাদেশি পাসপোর্টে স্পষ্ট করে লেখা থাকত—‘এক্সেপ্ট তাইওয়ান অ্যান্ড ইসরায়েল’। অর্থাৎ কূটনৈতিক কারণে এই দুই দেশে ভ্রমণ কিংবা সরাসরি ট্রানজিট নেওয়া সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কোম্পানিকে জানালাম, সরাসরি এভাবে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমাকে তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে ঘুরিয়ে নিতে হবে। নিরুপায় হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল আমাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর।
সিঙ্গাপুরে পা রেখে বুঝলাম, এখান থেকে যদি কোনো কারণে দেশে ফিরতে হয়, তবে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আর কোনোদিন বিদেশি জাহাজে ফেরা হবে না। কোম্পানিকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম আমার সংকটের কথা। তারা চমৎকার পেশাদারিত্ব দেখাল; সিঙ্গাপুরেই আমাকে ভালো হোটেলে রেখে তিন-চার দিনের ভেতর দ্রুত লন্ডনের ভিসার ব্যবস্থা করে দিল।
এরপর শুরু হলো আমার জীবনের অন্যতম দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এক আকাশযাত্রা। সিঙ্গাপুর থেকে উড়ে গিয়ে যখন লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামলাম, তখন শরীর জুড়ে কেবল অবসাদ। সেখানে কোম্পানির প্রতিনিধি আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে সরাসরি নিয়ে গেল আমেরিকান দূতাবাসে। দিন কয়েকের ভেতর নিউ ইয়র্কের ট্রানজিট ভিসার সিল পড়ে গেল পাসপোর্টে। লন্ডনের আকাশ ছেড়ে আমি তখন বিখ্যাত প্যান আমেরিকান এয়ারলাইনসের বোয়িং বিমানে। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বিমানটি যখন নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাটি স্পর্শ করল, তখন মনে হচ্ছিল স্বপ্নের এক অচেনা দুনিয়ায় পা রেখেছি। তবে নিউ ইয়র্কের চোখ ধাঁধানো আলোয় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সেখান থেকে স্থানীয় একটি ছোট বিমানে চড়ে আমাকে পাঠানো হলো কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের এক নিরিবিলি বন্দর শহর ব্রিজপোর্টে।
সেখানেই পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল আমার নতুন কর্মস্থল—দানবীয় এক তেলবাহী জাহাজ, নাম তার ‘মনটানা’। বিশাল এই ট্যাংকার তখন একেবারে খালি; ব্রিজপোর্ট থেকে তার যাওয়ার কথা দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায়। জাহাজের গ্যাংওয়ে বেয়ে ওপরে উঠে যখন ব্রিজের দিকে এগোচ্ছি, তখনই চমকে গেলাম। একগাল চেনা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের পুরোনো পরিচিত চিফ অফিসার, শ্রদ্ধেয় ক্যাপ্টেন মনিরুল ইসলাম সাহেব। দূর পরবাসে, অচেনা এক জাহাজে স্বদেশি এবং বিশেষ করে এমন একজন অভিজ্ঞ ও স্নেহশীল অভিভাবককে পেয়ে বুক থেকে যেন এক পাহাড়সম ভার নেমে গেল।
মনটানা ব্রিজপোর্ট ছেড়ে পাড়ি জমাল ভেনেজুয়েলার ঐতিহাসিক মারাকাইবো বন্দরের পানে। সেখানে পৌঁছে জাহাজের বিশাল সব ট্যাংকে গভীর মনোযোগ আর সতর্কতার সঙ্গে বোঝাই করা হলো অপরিশোধিত তেল। সেখান থেকে আবার মহাদেশ পাড়ি দেওয়ার পালা। আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের ঢেউ চিরে আমাদের তেলবাহী জাহাজ গিয়ে ভিড়ল রূপকথার শহর ইতালির ভেনিস বন্দরে। খালের শহর ভেনিসে তেল খালাসের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজটা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শেষ হলো।
ভেনিসের কাজ চুকিয়ে কোম্পানি থেকে নতুন বার্তা এলো—জাহাজ নিয়ে চলে যেতে হবে ইতালিরই আরেক উপকূলীয় বন্দর অগাস্টায়। সেখানে গিয়ে কোনো জেটি পাওয়া গেল না, অগাস্টার শান্ত নীল সাগরের বহির্নোঙরে অলস সময় নিয়ে নোঙর ফেলে পড়ে রইল মনটানা। সাগরের বুকে এভাবে জাহাজে ভেসে থাকার দিনগুলো অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতায় মোড়া থাকে। বেশ কিছুদিন অপেক্ষার পর নতুন নির্দেশে আমরা মুখ ঘোরালাম উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার দিকে। সেখানে নতুন করে তেল বোঝাই করে আমাদের গন্তব্য হলো স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রধান বন্দর লাস পালমাস। আটলান্টিকের মাঝে এই সুন্দর দ্বীপে তেল খালাস হতে না হতেই রেডিও রুমে বেজে উঠল পরবর্তী আদেশের সংকেত।
এবার যেতে হবে পশ্চিম আফ্রিকার অশান্ত উপকূলে—নাইজেরিয়ার বনি বন্দরে। মনটানার ডাচ ক্যাপ্টেন ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ এবং দারুণ সতর্ক এক মানুষ। বনি নদীর মুখে জাহাজ ঢোকার আগেই তিনি ব্রিজে সব অফিসার ও ক্রুদের ডেকে জরুরি বৈঠক করলেন। ক্যাপ্টেন অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, বনি বন্দর সাধারণ কোনো সমুদ্রবন্দর নয়, এটি অনেকটা রিভার পোর্টের মতো দুর্গম ও অরক্ষিত এলাকা। এখানে সর্বক্ষণ কড়া পাহারা বসাতে হবে। গভীর রাতে জাহাজে অনেক ধূর্ত স্থানীয় দুষ্কৃতকারী ও স্থানীয় মহিলারা উঠবে। এদের আসল মতলব জাহাজের দামি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম চুরি করা।
বনি বন্দরে নোঙর করার পর আমরা পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু মধ্যরাত পেরোতেই ক্যাপ্টেনের আশঙ্কাই সত্যি হলো। ছোট ছোট নৌকা করে নদীর অন্ধকার চিরে জাহাজের রেলিং বেয়ে উঠে এলো একদল মানুষ। তাদের মধ্যে যেমন ছিল পেশাদার চোর ও ছিনতাইকারী, তেমনি ছিল একদল আবেদনময়ী স্থানীয় নারী। তাদের উপস্থিতিতে ডেকে এক অদ্ভুত গোলমেলে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। সেই মহিলারা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে নাবিক আর অফিসারদের সঙ্গে মিষ্টি হেসে খাতির জমিয়ে নিজেদের রূপের জালে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা শুরু করল। আমাদের জাহাজে তখন বেশ কয়েকজন যুগোস্লাভ অফিসার ছিলেন; তাদের মানসিকতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মহিলারা তাদের কেবিনে ঢুকে মিষ্টি আলাপে পুরো রাত ব্যস্ত রাখল।
এদিকে সবার নজর যখন অন্যদিকে, বাইরে তখন চলছিল নিখুঁত এক ডাকাতি। পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের চোখ তো ছানাবড়া! ডেকে গিয়ে দেখি, জাহাজের সবচেয়ে মূল্যবান আপৎকালীন সম্পদ—লাইফবোটের ভেতর যত দামি সামগ্রী, বেতার যন্ত্র, খাদ্য ও দিকনির্ণয় সরঞ্জাম ছিল, চোরের দল রাতের আঁধারে তার সবটুকু সাফ করে নিয়ে চলে গেছে। রাতের রূপের ফাঁদে অফিসারদের মশগুল রেখে এত বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে, তা সত্যিই ছিল এক চরম নাটকীয় অথচ বাস্তব শিক্ষা।
বনি বন্দর থেকে তেল লোড করে আমরা বাঙ্কারিং বা জ্বালানি নেওয়ার জন্য চলে এলাম আইভরি কোস্টের বন্দর আবিদজানে। সেখান থেকে জ্বালানি নিয়ে আবার ফিরতি পথে স্পেনের লাস পালমাসে গিয়ে কার্গো খালাস করলাম। পরবর্তী নির্দেশের আশায় জাহাজ নিয়ে গিয়ে নোঙর ফেললাম জিব্রাল্টার প্রণালীর মুখে। কিন্তু সেখানে কোনো নিশ্চিত কার্গো না পেয়ে কোম্পানির নির্দেশে জাহাজ আবার ফিরে এলো ইতালির নাপলস বন্দরে।
নাপলসের জেটিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ অনুভব করলাম, সাগরের নোনা জলে টানা ঘুরতে ঘুরতে আমার ভেতরের মানুষটা বড় বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বিদেশি জাহাজে একটানা অনেকদিন কাজ করা হয়ে গেছে, দেনার বোঝাও অনেকটাই নেমে গেছে। ক্যালেন্ডার তখন ১৯৮০ সালের জুলাইয়ের শেষ প্রান্ত নির্দেশ করছে। আমি মন শক্ত করে কোম্পানির কাছে আবেদন জানালাম—এবার আমাকে অব্যাহতি দিয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হোক। কোম্পানি আমার কাজের মূল্যায়নে খুশি হয়ে কোনো আপত্তি করল না। নাপলস থেকে রোম, সেখান থেকে দিল্লি হয়ে অবশেষে এক শান্ত বিকেলে ঢাকা এসে নামলাম। শেষ হলো সেকেন্ড মেট পাস করার পর বিদেশি জাহাজে কাটানো আমার অত্যন্ত ঘটনাবহুল, রোমাঞ্চকর এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সমুদ্রজীবন।
দেশে ফিরে যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি, তখনই ডাক এলো বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের সদর দপ্তর থেকে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ দর্শাতে আমাকে একটি আনুষ্ঠানিক কৈফিয়ত তলবের চিঠি দেওয়া হলো। বিএসসির কর্তারা কড়া গলায় জানতে চাইলেন, পাস করার এতগুলো দিন সরকারি চাকরিতে যোগ না দিয়ে আমি কোথায় লাপাত্তা ছিলাম? তবে সেই সময়ে দেশে দক্ষ ও সার্টিফাইড অফিসারের চরম আকাল থাকায় তারা আমার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারল না। কিছুটা রাশভারী সুরে আমাকে জানিয়ে দেওয়া হলো, শাস্তি হিসেবে আমাকে কয়দিন ‘বিনা বেতনে’ রাখা হলো।
তাদের মুখে এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমার ভেতরে ভেতরে এক চিলতে হাসি খেলে গেল। মনে মনে ভাবলাম, বিদেশি জাহাজে ডলারের হিসেবে যে আয় আমি করে এসেছি, তাতে এই কয়দিনের দেশীয় বিনা বেতনের চাকরিতে আমার কিছুই এসে যায় না। মুখে কোনো বিকার না দেখিয়ে অত্যন্ত বাধ্য ছেলের মতো তাদের এই শাস্তির রায় মাথা পেতে নিলাম। দেখলাম কর্তারাও এতেই সন্তুষ্ট হলেন এবং কালবিলম্ব না করে আমাকে তাঁদের পরবর্তী জাহাজে যোগদানের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।
কার্লসহ্যামের সেই নিস্তরঙ্গ সুখ আর ক্যালকাটা পোর্টের কান্না
পোর্ট সুদানের তপ্ত রোদে তখন খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। তবে আমাদের জাহাজের পণ্য খালাসের কাজটা শেষ হয়ে গেল বেশ দ্রুতই। সাগরের নোনা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত মিলবে কি না ভাবছিলাম, ঠিক তখনই বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন থেকে ক্যাপ্টেনের টেবিলে এসে পৌঁছাল এক জরুরি তারবার্তা। জাহাজ খালি করে বসে থাকার জো নেই; হুকুম এসেছে—এই খালি জাহাজ হাঁকিয়ে ছুটতে হবে সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে, কার্লসহ্যাম নামের এক অচেনা বন্দরে।
হিসেব কষে দেখা গেল, লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খাল ধরে ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কার্লসহ্যামের দূরত্ব কম করে হলেও সাড়ে চার হাজার নটিক্যাল মাইল। পথটা চাট্টিখানি কথা নয়, বিশেষ করে খালি জাহাজে যখন সাগরের ঢেউয়ের দোলাটা একটু বেশিই চড়ে বসে। তবে ঈশ্বরের কৃপায় পথটা কেটে গেল বেশ নির্বিঘ্নেই। ব্রিটেনের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ব্রিকসামে যখন পৌঁছালাম, তখন আবহাওয়া বেশ শান্ত। সেখান থেকে জাহাজে তোলা হলো অভিজ্ঞ নর্থ সি পাইলটকে। উত্তর সাগরের জটিল জলপথ পেরিয়ে অবশেষে একদিন আমাদের দানবাকৃতির জাহাজটি গিয়ে ভিড়ল সুইডেনের ছোট্ট কার্লসহ্যামের জেটিতে।
কার্লসহ্যাম ছবির মতো সাজানো এক শান্ত মফস্বল শহর। মূলত উন্নত মানের সিজন কাঠের বাণিজ্যের জন্যই এই বন্দরের খ্যাতি। তবে আমাদের জাহাজটি যখন খালের মতো সরু জলপথ চিরে একেবারে শহরের কোল ঘেঁষে ভেতরে ঢুকে পড়ল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। স্থানীয়দের কাছে এত বড় জাহাজের আগমন ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য। পরদিন সকালে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় চোখ বুলিয়ে তো আমরা তাজ্জব! ফলাও করে ছাপা হয়েছে—কার্লসহ্যামের ইতিহাসে নাকি এত বড় জাহাজ এর আগে কখনো নোঙর ফেলেনি। জেটি আর শহরের কোনো দূরত্ব ছিল না বললেই চলে; ব্রিজে দাঁড়িয়ে ডেক থেকে নিচের দিকে তাকালে মনে হতো যেন গোটা শহরটাই আমাদের পায়ের তলায় হাতছানি দিচ্ছে।
বিকেলটা তো ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে শহর দেখে দেখেই কেটে গেল। আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল পরদিন ভোরে। ঘুমভাঙা চোখে ডেকের রেলিংয়ে গিয়ে দাঁড়ায়ে দেখি এলাহি কাণ্ড! নিচে হাজারো মানুষের ভিড়। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই দল বেঁধে জেটিতে হাজির হয়েছে আমাদের এই বিশাল জাহাজটা একনজর দেখার জন্য। আমরা তখন জাহাজে দুই নবীন ক্যাডেট—আমি আর বর্তমানের ক্যাপ্টেন জাফর। নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল বটে, তবে একটু ভয়ও ছিল। স্থানীয়রা নিচ থেকে ইশারা আর ভাঙা ইংরেজিতে আকুতি জানাতে লাগল তারা জাহাজের ভেতরে এসে দেখতে চায়। এত বড় সিদ্ধান্ত তো আমাদের হাতে নেই। ছুটলাম ক্যাপ্টেন বোদন কোরসাক আর আমাদের রাশভারী চিফ অফিসার মোখলেসুর রহমান সাহেবের কাছে।
ক্যাপ্টেন কোরসাক আর মোখলেসুর সাহেব কিছুক্ষণ গুম হয়ে ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, ঠিক আছে, ওদের উপরে আসতে দাও। অনুমতি মেলামাত্র শুরু হলো সিঁড়ি বেয়ে মানুষের স্রোত। শত শত কৌতূহলী চোখ ছুঁয়ে দেখছিল জাহাজের প্রতিটি ইঞ্চি। সেই ভিড়ের মাঝে কয়েকটি নিষ্পাপ সুইডিশ শিশু-কিশোর এসে ভিড় জমাল আমাদের কেবিনে। ওদের চোখেমুখে রোমাঞ্চ উপচে পড়ছে। আমাদের টেবিলে সাধারণ কিছু ম্যাচবক্স রাখা ছিল; দূর প্রাচ্য আর বিলেতি ছাপ মারা সেই সামান্য দিয়াশলাইয়ের বাক্সগুলো দেখেই ওদের সে কি নিখাদ আনন্দ! পরম আগ্রহে ওরা সেগুলো চেয়ে নিল। আমরাও ভালোবেসে ওদের হাতে তুলে দিলাম।
পরদিন বিকেলে ঘটল আরেক মিষ্টি ঘটনা। গতকাল আমাদের কেবিনে যে ছেলেরা এসেছিল, তারা হঠাৎ দুটি সুন্দর সাইকেল ঠেলে নিয়ে হাজির হলো গ্যাংওয়ের মুখে। সাইকেল দুটি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, তোমরা তো আমাদের মেহমান, এই সাইকেলে চড়ে মন ভরে আমাদের পুরো শহর ঘুরে এসো। সেই সাইকেলে চেপে কার্লসহ্যামের পরিচ্ছন্ন অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি আজও আমার মনের মণিকোঠায় অমলিন।
সেখানেই এক বিকেলে আমরা অংশ নিয়েছিলাম একটি স্থানীয় মেলায়। আমাদের জাহাজের সুইডিশ এজেন্ট মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। কথার ফাঁকে আমি তাকে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের দেশ তো পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত, আপনাদের কোনো সামাজিক অভাব বা কষ্ট চোখে পড়ে না। তা আপনাদের জীবনে আসলে কোনো সমস্যা আছে? কথাটা শুনে ভদ্রলোক একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আর এটাই হলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা! মানুষের জীবনে কোনো উদ্বেগ নেই, লড়াই নেই—এই একঘেয়ে নিস্তরঙ্গ সুখই নাকি তাদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ। গভীর সেই দার্শনিকের মতো কথা শুনে আমি আর জাফর কেবল মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সিজন কাঠ বোঝাই করে আমরা বিদায় জানালাম কার্লসহ্যামকে।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক হলো নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত বন্দর রটারড্যাম। সমুদ্রের বুকে জীবনের গতিপথ ঠিক এভাবেই বাঁক নেয়। রটারড্যামের আকাশ তখন মেঘলা। সেখানে ভারতের জন্য বেশ বড় চালানের ময়দা লোড করা হলো। রটারড্যামে কার্গোর কাজ সেরে আমরা যখন জার্মানির হামবুর্গে নোঙর ফেললাম, তখন নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো। এলবে নদীর বুকে আমাদের জাহাজ নোঙর করল বটে, কিন্তু নদীর মাঝখানে বার্জ ভিড়িয়ে সেখানে ভারী মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি লোড করা হচ্ছিল। আমাদের তখন তরুণ বয়স, হামবুর্গের বিখ্যাত শহরটা একনজর ঘুরে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিল।
ছুটে গেলাম মোখলেসুর রহমান সাহেবের কাছে শোর লিভের অনুমতির দরখাস্ত নিয়ে। কিন্তু চিফ অফিসার একবাক্যে নাকচ করে দিয়ে কঠিন স্বরে বললেন, নো, নো শোর লিভ ফর ইউ! আমরা যতই মিনতি করি, তিনি ততই অনড়। একপর্যায়ে তিনি গম্ভীর মুখে বুঝিয়ে দিলেন, নদীর মাঝখানে মালামাল লোড হচ্ছে, কোনো ঝামেলা হলে সামলানো যাবে না। তাছাড়া বড়দের মুখে শুনলাম, হামবুর্গের রাতের শহর নানা রকম বিপথগামী প্রলোভন আর অখ্যাত ব্রোথেল-পাড়ার জন্য কুখ্যাত। তরুণ ক্যাডেটদের সেসব চক্কর থেকে বাঁচাতেই অভিভাবকতুল্য চিফ অফিসার আমাদের ডেক ছাড়ার অনুমতি দেননি। অগত্যা মন খারাপ করে জাহাজের রেলিং ধরে দূর থেকেই হামবুর্গের আলোর ঝলকানি দেখে সান্ত্বনা খুঁজতে হলো।
হামবুর্গ থেকে আমরা গেলাম লন্ডনের টেমসের মোহনায়, ঐতিহাসিক টিলবারি পোর্টে। সেখানে সামান্য কিছু কার্গো তোলা হলো বটে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেখানেও নামার সুযোগ জুটল না। এরপর সমস্ত মালামাল গুছিয়ে জাহাজ মুখ ঘোরাল ভারত মহাসাগরের দিকে। সুদূর লন্ডন থেকে টানা সাত হাজার তিনশো নটিক্যাল মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে আমাদের জাহাজ এসে নোঙর ফেলল মাদ্রাজে। মাদ্রাজের তীব্র ভ্যাপসা গরমে বেশ কিছুদিন ধরে নামানো হলো রটারড্যাম থেকে তুলে আনা সেই ময়দার বস্তা আর ভারী সব যন্ত্রপাতি।
মাদ্রাজের কাজ চুকিয়ে আমরা যখন কলকাতা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখনো আমরা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি কী এক বজ্রপাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ক্যালকাটা পোর্টের মোহনায় পৌঁছে জাহাজ যখন জেটিতে ভিড়ছে, চারপাশের পরিবেশে এক অস্বাভাবিক স্তব্ধতা আর থমথমে ভাব দেখতে পেলাম। পাইলট থেকে শুরু করে জেটির কুলি, স্টেভেডর আর শ্রমিকদের মুখগুলো রক্তশূন্য, গম্ভীর। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সাধারণ ভারতীয় শ্রমিকরা কান্নায় ভেঙে পড়ে হাহাকার করে উঠল। ওদের ক্ষুব্ধ আর শোকাতুর কণ্ঠের একটাই আর্তনাদ—তোমরা এটা কী করলে! তোমরা তোমাদের বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেললে?
পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর তখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সাগরে বিচ্ছিন্ন থাকায় আমরা কিছুই জানতে পারিনি। হঠাৎ এই নৃশংস খবর শুনে আমাদের পায়ের নিচ থেকে যেন জাহাজের লোহার ডেক সরে গেল। বাঙালি নাবিক হিসেবে আমাদের বুকের ভেতর কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। জেটির মানুষগুলোর চোখে আমাদের দিকে এক মিশ্র আক্ষেপ আর করুণার দৃষ্টি। স্থানীয় এজেন্ট আর কর্মকর্তাদের আমি বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস চেপে শুধু এইটুকুই বললাম, আমরা জাহাজের সামান্য নাবিক, পলিটিক্সের খবর আমাদের জানা নেই; কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই শোক সইবার শক্তি আমাদেরও নেই। সেই মানুষগুলোর চোখে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আক্ষেপ দেখেছিলাম, তা কোনোদিন ভোলার নয়।
কলকাতায় বাকি পণ্য খালাসের পুরো সময়টা আমাদের কাটল এক অবর্ণনীয় বিষাদ আর গ্লানির ভেতর দিয়ে। এরপর অবশেষে একদিন জাহাজ এসে পৌঁছাল আমাদের চেনা ঘরের আঙিনায়—চট্টগ্রাম বন্দরে। নোঙর পড়ার পর সমস্ত মালামাল খালাসের মাধ্যমে শেষ হলো আমাদের জীবনের প্রথম দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর এবং দিনশেষে এক গভীর বেদনায় মোড়া সমুদ্রযাত্রা।
‘বাংলার আশা’য় নতুন যাত্রা
এমভি ‘ঢাকা’ জাহাজে ছোট ছোট কিছু ভয়েজে কাজ করার পর সমুদ্রের প্রতিটি গতিপথ যেন আমার চেনা হয়ে উঠেছিল। চট্টগ্রাম থেকে করাচি, কিংবা নদীপথ ধরে গিয়ে কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে নোঙর ফেলে পণ্য খালাস করার সুবাদে নেভিগেশনের জটিল অংকগুলো আমার মাথায় একেবারে গেঁথে গিয়েছিল। ডেক ক্যাডেট হলেও কাজের দক্ষতায় জাহাজে থার্ড অফিসারের গুরুদায়িত্ব তখন আমার কাঁধেই। এমন সময় বিএসসি (বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন) সদর দপ্তর থেকে নতুন সরকারি চিঠি এলো। হাতে পাওয়ার পর দেখলাম, আমাকে অবিলম্বে ‘বাংলার আশা’ জাহাজে যোগ দিতে হবে। রুট—ইউরোপ কন্টিনেন্টাল। অর্থাৎ, এবার পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ মহাসমুদ্র!
১৯৭৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। এক বুক রোমাঞ্চ, অদম্য উত্তেজনা আর সমুদ্রকে নতুন করে জয় করার নেশা নিয়ে আমি ‘বাংলার আশা’ জাহাজে পা রাখলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে আমি ডেক ক্যাডেট হলেও ক্যাপ্টেনের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—থার্ড অফিসারের পুরো ডিউটি আমাকেই সামলাতে হবে।
জাহাজের পরিবেশটা ছিল যেন এক ভাসমান ছোটখাটো বাংলাদেশ। ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আজিজুল হক স্যার। উনি জাহাজে একা আসেননি; সাথে নিয়ে এসেছিলেন উনার সহধর্মিণী আর দুই ছোট্ট ফুটফুটে কন্যাকে—যাদের নাম ছিল কলি ও পাপড়ি। সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদুল আনোয়ার ভাইও ছিলেন আমাদেরই একাডেমির, তিনিও উনার সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জাহাজে উঠেছিলেন। পুরো জাহাজে তাই এক অদ্ভুত পারিবারিক উষ্ণতা কাজ করত। আমাদের চিফ অফিসার ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানার অধিবাসী—ফ্রাঙ্ক ম্যানসা, বেশ স্বাস্থ্যবান, কৃষ্ণকায় কিন্তু মানুষ হিসেবে অত্যন্ত দূরদর্শী ও শান্ত মেজাজের। আর চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন মেরিন একাডেমি ফার্স্ট ব্যাচের মালেক স্যার। উনিও সাথে এনেছিলেন উনার স্ত্রী আর ছোট ছেলে রবিনকে।
মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে নোঙর ফেলে আমরা প্রথমে লোড করলাম বাংলাদেশের সুপরিচিত পাট ও পাটজাত পণ্য। এরপর জাহাজ চলে এলো চট্টগ্রামে। সেখান থেকে জাহাজের পেটে বিশাল বিশাল সুগন্ধি চায়ের পেটি এবং সিবিসির বিশাল সব রোল লোড করা হলো। মালামাল সব সঠিক নিয়মে শক্ত করে বাঁধা শেষ হলে জাহাজের ভোঁ বাজল। দিগন্তের সীমানা পেরিয়ে আমাদের জাহাজ যাত্রা করল ইউরোপের পথে।
ভূমধ্যসাগরের তাণ্ডব ও জিব্রাল্টারের নিঃশব্দ আতঙ্ক
জাহাজ যখন লিবিয়া উপকূলের কাছাকাছি, ভূমধ্যসাগরের বুক চিরে আমাদের জাহাজ এগিয়ে চলছিল স্বাভাবিক গতিতেই। কিন্তু হঠাৎ করেই রেডিও রুম থেকে একটি জরুরি ওয়েদার রিপোর্ট এসে পৌঁছাল। তাতে বলা হলো—সামনে ভীষণ প্রতিকূল আবহাওয়া।
ক্যাপ্টেন খবর পাওয়া মাত্রই নিজে ব্রিজে চলে এলেন। চেহারায় চরম চিন্তার ছাপ। আমরা সবাই কম-বেশি ব্রিজে উপস্থিত হয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখছিলাম। বাইরে তাকালে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল—আকাশ পরিষ্কার, বাতাসের কোনো প্রচণ্ড বেগ নেই, ঝড়ের কোনো গর্জন নেই, কিন্তু সমুদ্রের পানি যেন পাগল হয়ে উঠেছে! বিশালাকার ঢেউ একের পর এক ধেয়ে এসে জাহাজের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়তে লাগল।
ক্যাপ্টেন সাহেব আমাদের বুঝিয়ে বললেন, “ভূমধ্যসাগরের উত্তর পাশে যে বিশাল আল্পস পর্বতমালা আছে, সেখান থেকে ঠান্ডা ও ভারী বায়ুপ্রবাহ দ্রুত বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। এই বাতাসের সুনির্দিষ্ট চাপ সমুদ্রের তলদেশ ও ওপরের পানিকে এমনভাবে ক্ষিপ্ত করে তোলে যে, কোনো বাতাস ছাড়াই দানবীয় ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।”
পরের কয়েক ঘণ্টা আমাদের জন্য ছিল এক চরম পরীক্ষার মুহূর্ত। আমাদের ‘বাংলার আশা’ পানির ওপর কাঠকুটোর মতো দুলতে লাগল। ডান থেকে বামে প্রায় ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত হেলে যাচ্ছিল জাহাজ! একবার ওপরের দিকে উঠছে তো পরক্ষণেই ধপাস করে নিচে নেমে যাচ্ছে। জাহাজের ভেতরে মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা তো দূরের কথা, কোনো জিনিসপত্রও স্থির ছিল না।
সাগরের উত্তালতা কিছুটা থামলে ক্যাপ্টেন আমাকে বললেন, “হাবিব, তুমি একটু নিচে গ্যালিতে (রান্নাঘর) গিয়ে দেখে এসো তো কি অবস্থা।” আমি নিচে গিয়ে যা দেখলাম, তা দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! রান্নাঘরের সমস্ত বাসনপত্র, চীনা মাটির প্লেট, গ্লাস সব ছিটকে পড়ে ভেঙে একদম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। আর ক্রু ও অফিসারদের জন্য যে রান্না করা হয়েছিল, তা পুরো মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খালাস! চাল-ডাল-ঝোল সব মেঝেময় একাকার। খাবার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
ক্যাপ্টেন সাহেব ধীরকণ্ঠে বললেন, “এসব নিয়ে একদম মাথা ঘামাবে না। যা আছে তাই খেয়ে চালিয়ে নাও, আগে সবাই মিলে পুরো জাহাজ পরিষ্কার করো।” আমরা জুনিয়র অফিসাররা ক্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে গ্যালি পরিষ্কার করলাম। কোনো বাতাস ছাড়া সমুদ্রের এমন ভয়াল ও উন্মত্ত রূপ আমি আমার এতদিনের মেরিন জীবনে আর কখনো দেখিনি।
এই বিপদ কাটিয়ে ওঠার পর আমাদের সামনে এলো জিব্রাল্টার প্রণালী পার হওয়ার চ্যালেঞ্জ। নেভিগেশনাল চার্ট হলো একটা বিশাল ম্যাপ, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত কোস্টলাইন বা উপকূলরেখা নিখুঁতভাবে আঁকা থাকে। আমরা রাডার, কম্পাস কিংবা সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান থেকে ল্যাটিচিউড ও লঙ্গিচিউড (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ) হিসাব করে পেন্সিল দিয়ে চার্টের ওপর জাহাজের পজিশন পয়েন্ট আউট করি।
ক্যাপ্টেন সাহেব চার্টের ওপর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পেন্সিল দিয়ে দাগ কেটে আমাকে নির্দেশ দিলেন, “জাহাজ যখন এই নির্দিষ্ট দাগের কাছাকাছি আসবে, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে। আমি ব্রিজে থাকব।”
কিন্তু জাহাজ সেই দাগে পৌঁছানোর অনেক আগেই দেখি ক্যাপ্টেন সাহেব নিজে থেকেই ব্রিজে হাজির! উনি সারারাত ঘুমাতে পারেননি। আমি বললাম, “স্যার, এত আগে চলে এলেন যে? চারপাশের সমুদ্রে তো তেমন কোনো জাহাজের ভিড় নেই।”
ক্যাপ্টেন একটু হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি তো এখনো অনেক ইয়ং, হাবিব! সাগরের এই জায়গাটা যে কতটা বিপজ্জনক তা তুমি বুঝবে না। পাকিস্তান আমলে আমি যখন চিফ অফিসার বা সেকেন্ড অফিসার ছিলাম, তখন দেখেছি—জিব্রাল্টার প্রণালীর এই আন্তর্জাতিক ওয়াটারওয়েতে জাহাজের ভিড় আর সরু রুট দেখে বড় বড় অভিজ্ঞ পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনদের পেছনের দিক ভয়ে হলুদ হয়ে যেত!”
আসলেই, আটলান্টিক মহাসাগর আর ভূমধ্যসাগরের এই সংযোগস্থলে চারদিক থেকে শত শত ছোট-বড় জাহাজ এসে হাজির হয়। একটু অসাবধানতা হলেই মুখোমুখি সংঘর্ষ নিশ্চিত! তাছাড়া তখন তো আর এখনকার মতো আধুনিক জিপিএস বা পিনপয়েন্ট স্যাটেলাইট সিস্টেম ছিল না; একমাত্র ভরসা ছিল রাডার। রাডারে যদি কোনো জাহাজের সিগন্যাল ভুল হিসাব হয়, তবেই বিপদ!
সব শঙ্কা পেছনে ফেলে অবশেষে ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্রিক্সহাম বন্দরে এসে পৌঁছালাম। ওখান থেকে জাহাজে উঠলেন একজন অভিজ্ঞ ‘ডিপ-সি পাইলট’। ডিপ-সি পাইলটরা বিশাল সমুদ্রে জাহাজকে পথ দেখিয়ে নিরাপদ বন্দরে নিয়ে যান। তারা জাহাজেই ঘুমান, জাহাজেই খান এবং দীর্ঘ ২-৩ দিন ব্রিজে থেকে দিকনির্দেশনা দেন। উনার দক্ষ পরিচালনায় আমাদের জাহাজ অবশেষে গিয়ে নোঙর ফেলল স্কটল্যান্ডের ঐতিহাসিক ডান্ডি বন্দরে।
সমুদ্রের অচেনা ক্যানভাসে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা
ডান্ডি বন্দরে কাটানো দিনগুলোতে আরও কিছু মজার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একদিন কেবিনে বসে আছি, হঠাৎ ডিউটি অফিসার এসে খবর দিল, “স্যার, আপনার একটা টেলিফোন এসেছে।” দূর দেশে আমায় কে ফোন করবে ভেবে অবাক হয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চেনা গলায় আওয়াজ এলো, “হাবিব নাকি? আমি জাহাঙ্গীর!”
প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে মনে পড়ল—আরে, এ তো আমার স্কুলের পুরোনো বন্ধু জাহাঙ্গীর! সে বহুকাল আগে এক স্কটিশ মেয়েকে বিয়ে করে স্কটল্যান্ডেই থিতু হয়েছে এবং এখন ব্রিটিশ নাগরিক। স্কটল্যান্ডের স্থানীয় পেপারে নিয়মিত ‘শিপিং নিউজ’ বের হতো, যেখানে কোন দেশের জাহাজ বন্দরে এসেছে তার তালিকা থাকত। সে পেপারে ‘বাংলার আশা’ জাহাজের নাম দেখে এজেন্ট অফিসে গিয়ে ক্রু লিস্ট ঘেঁটে আমার নাম খুঁজে পেয়েছে! পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে সেই কদিন স্কটল্যান্ডের আনাচে-আনাচে ঘুরে আমাদের সময়টা বেশ ভালোই কেটেছিল।
ডান্ডি থেকে মালামাল খালাস করে আমরা চলে গেলাম ইউরোপের ব্যস্ততম বন্দর রটারডাম, হামবুর্গ ও অ্যান্টওয়ার্পে। সেখান থেকে লোড করা হলো বিলাসবহুল ফিনিশড গুডস, ফ্রিজ, এমনকি বিশেষ উপায়ে প্যাক করা পণ্য, যা সুদূর বাংলাদেশে গিয়ে পৌঁছাবে।
এরপর ইংল্যান্ডের টিলবারি বন্দর। জাহাজের পুরোনো অশিক্ষিত কিন্তু অত্যন্ত অভিজ্ঞ ক্রুরা আঞ্চলিক ভাষায় এই টিলবারিকে বলত ‘তেলবাড়ি’! তারা এসে বলত, “স্যার, আমাদের পরবর্তী বন্দর তেলবাড়ি!”
এই টিলবারি থেকে আমি আর আমার জুনিয়র ক্যাডেট হেলাল ক্যাপ্টেন সাহেবের কাছ থেকে একদিনের বিশেষ ছুটি নিয়ে লন্ডনে ঘুরতে বের হলাম। এই প্রথম লন্ডন দেখা! ভূগর্ভস্থ টিউব রেলে চেপে যখন মূল শহরে উঠলাম, চারপাশের বিশাল বিশাল দালানকোঠা আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর দেখে চোখ কপালে ওঠার অবস্থা! হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ম্যাপ দেখে দেখে ঠিক সন্ধ্যার আগেই আবার জাহাজে ফিরে এসেছিলাম।
কলম্বোর ঘাড় নাড়া ও লবণ বোঝাইয়ের দিনগুলি
লন্ডনের টেমসের ধূসর কুয়াশা আর বিদায়ের বিষাদ পেছনে ফেলে আমাদের ‘বাংলার আশা’ আবার ভাসল অগাধ সাগরের নীল বুকে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তি থাকলেও মনের ভেতর ছিল দেশের দিকে ফেরার এক অদম্য টান। গন্তব্য এবার ভারত মহাসাগরের মুক্তা হিসেবে পরিচিত দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর। এই কলম্বোই ছিল ইউরোপ থেকে তুলে আনা আমাদের কার্গো খালাসের প্রথম বন্দর বা ফার্স্ট ডিসচার্জিং পোর্ট।
সুয়েজের জলরাশি ও লোহিত সাগরের উত্তাপ পেরিয়ে জাহাজ যখন কলম্বোর সুরক্ষিত পোতাশ্রয়ে নোঙর ফেলল, তখন চারপাশের উষ্ণ ক্রান্তীয় হাওয়া আমাদের শরীর জুড়িয়ে দিল। সাগরে একটানা ভেসে থাকার পর বন্দরে এসে মাটিতে পা রাখার যে ব্যাকুলতা, তা একজন খাটি নাবিক ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না। কার্গো খালাসের ফাঁকে কিছুটা ফুরসত মিলতেই আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যাপ্টেন হেলাল মনস্থির করলাম শহরটা একটু ঘুরে দেখব। নেভাল পোশাক ছেড়ে সাধারণ পোশাকে গ্যাংওয়ে দিয়ে নেমে এলাম জেটিতে।
সেখানে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল তিন চাকার বাহন, যা আমাদের দেশের সিএনজি অটোরিকশার মতোই স্থানীয় ট্যাক্সি। আমরা একটা ট্যাক্সির কাছে গিয়ে চালককে ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম, শহরে যাবে কি না। চালক অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় ঘাড় কাত করে দুদিকে মাথা নাড়ল। আমরা ভাবলাম সে যাবে না। পাশেই আরেকটা ট্যাক্সিওয়ালাকে গিয়ে একই প্রশ্ন করলাম; সেও একইভাবে চোখ বড় বড় করে মাথাটা ডানে-বাঁয়ে দুলিয়ে দিল। এভাবে একে একে তিন-চারজন চালককে জিজ্ঞেস করার পর সবার একই প্রতিক্রিয়া দেখে আমরা বেশ বিরক্ত ও হতাশ হয়ে পড়লাম। মেজাজ কিছুটা চড়ে যাওয়ায় একপর্যায়ে বলেই ফেললাম, তোমাদের কারও শহরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই মানে কী! আমাদের বিরক্তি দেখে এক চালক স্পষ্ট ইংরেজিতে হেসে বলে উঠল, স্যার, আমরা তো অবশ্যই যাব, আপনারা গাড়িতে উঠুন! আমরা তো তাজ্জব! বললাম, যাবে তো এতক্ষণ ধরে এমনভাবে মাথা নাড়ছিলে কেন? তখন সে হেসে রহস্য ভাঙল—শ্রীলঙ্কায় ওই ডানে-বাঁয়ে ঘাড় দোলানো মানে হচ্ছে সম্মতি বা ‘হ্যাঁ’, যা আমরা ভেবেছিলাম নাকচ করার সংকেত।
কলম্বোর এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটি বহু বছর পর আবারও জীবন্ত হয়ে উঠেছিল আমার জীবনে, যখন চিফ মেট সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য আয়ারল্যান্ডে পড়াশোনা করছিলাম। আমাদের নৌবিদ্যার আইরিশ শিক্ষক ক্লাসে খুব যত্ন করে সবাইকে পাঠদান করতেন। কোনো জটিল বিষয় বুঝিয়ে তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করতেন, সবাই বুঝতে পেরেছ কি না। আমাদের ক্লাসে শ্রীলঙ্কার এক তরুণ নাবিক ছিল। শিক্ষক প্রশ্ন করলেই সে কলম্বোর ট্যাক্সিচালকদের মতোই এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে দুপাশে মাথা নাড়াত। নিরীহ আইরিশ শিক্ষক ভাবতেন ছেলেটি হয়তো কিছুই বুঝতে পারেনি। তাই তিনি পরম মমতায় বলতেন, ঠিক আছে, তোমার সুবিধার জন্য পুরো অঙ্কটা আমি আবারও বোঝাচ্ছি। এভাবে পরপর দু-তিন দিন একই কাণ্ড ঘটার পর শিক্ষক কিছুটা ধৈর্য হারিয়ে তাকে বললেন, ক্লাসের বাকি সবাই বুঝে ফেলল, তুমি কেন বারবার আটকে যাচ্ছ? তখন সেই লঙ্কান ছাত্র আমতা আমতা করে বলল, স্যার, আমি তো প্রথমবারেই সবকিছু বুঝে ফেলেছি! হতবাক শিক্ষক তখন জিজ্ঞেস করলেন, বুঝে থাকলে তুমি এমন পাগলের মতো মাথা নাড়ছিলে কেন? ছেলেটি তখন লজ্জা পেয়ে বলল, স্যার, আমাদের দেশে এভাবে মাথা নাড়া মানেই হলো ‘হ্যাঁ, আমি বুঝেছি’। পুরো ক্লাসরুমে তখন হাসির রোল পড়ে গিয়েছিল, আর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল কলম্বোর সেই বন্দর আর ট্যাক্সিচালকদের মুখ।
কলম্বো বন্দরে কার্গো খালাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা পাড়ি জমালাম পরবর্তী বন্দর তুতুকোরিনের পানে। ভারতের তামিলনাড়ুর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে মান্নার উপসাগরের কোল ঘেঁষা এই প্রাচীন বন্দর। সেখানে খালাসের জন্য আমাদের জাহাজে পণ্য খুব সামান্যই ছিল। কিন্তু জেটিতে নোঙর ফেলতেই প্রধান কার্যালয় থেকে রেডিও মেসেজে এক নতুন নির্দেশ এলো। বাংলাদেশ সরকারের জরুরি চাহিদায় সেখান থেকে আমাদের জাহাজে ফুল লোড লবণ বোঝাই করতে হবে দেশের জন্য।
তুতুকোরিন বন্দরে তখন গভীর জলের ড্রাফট না থাকায় আমাদের বিশাল জাহাজকে রাখা হলো আউটার অ্যাঙ্করেজে, অর্থাৎ গভীর সাগরের বহির্নোঙরে। মূল উপকূল থেকে বড় বড় কাঠের বার্জে করে বস্তা বস্তা লবণ জাহাজের পাশে আনা হতো এবং ক্রেন দিয়ে তুলে জাহাজের খোল ভরানো হতো। গভীর সাগরের ঢেউয়ের দোলা আর ধীরগতির লোডিংয়ের কারণে প্রায় নয় থেকে দশ হাজার টন সাদা লবণ বোঝাই করতে আমাদের লেগে গেল দীর্ঘ পনেরো থেকে বিশটি দিন। জাহাজে এই দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগে আমরা কয়েকজন অফিসার ছুটি নিয়ে ঘুরে এসেছিলাম তামিল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র মাদুরাই নগরীসহ আশপাশের বেশ কিছু ঐতিহাসিক শহর ও প্রাচীন মন্দিরে। ভ্রমণ আর বৈচিত্র্যে দিনগুলো বেশ আনন্দেই কেটেছিল। অবশেষে লবণবোঝাই জাহাজ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে আমরা ফিরে এলাম দেশের মাটিকে আলিঙ্গন করতে। ১৯৭৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর ফেলার মধ্য দিয়ে সফলভাবে সমাপ্ত হলো ‘বাংলার আশা’ জাহাজে কাটানো আমার প্রথম সমুদ্রযাত্রা।
দ্বিতীয় ভয়েজে শাহপুরের বিষাক্ত সালফার
তবে নাবিকের জীবনে নোঙর মানেই চিরস্থায়ী স্থিতি নয়। চট্টগ্রামে অল্প কিছুদিন অবস্থানের পরই শুরু হলো বাংলার আশার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার জোর প্রস্তুতি। দ্বিতীয় ভয়েজের রুটটা ছিল তৎকালীন সময়ের প্রচলিত ও অত্যন্ত ব্যস্ত বাণিজ্যিক নৌপথ। জাহাজের খোলে বিপুল পরিমাণ পাটজাত দ্রব্য ও চটের থলে বোঝাই করে আমরা এবার সরাসরি ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় আট হাজার নটিক্যাল মাইলের এক বিশাল পথ। সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে একটানা, কোথাও না থেমে পুরো পথ অতিক্রম করে আমাদের জাহাজ গিয়ে ভিড়ল ফ্রান্সের উত্তরের প্রাচীন বন্দর বুলনে।
বুলনে ফরাসি ক্রেতাদের জন্য কিছু পাটজাত পণ্য খালাস করে আমরা চলে গেলাম স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ডান্ডি বন্দরে, যা একসময় বাংলার কাঁচা পাট আর চটের প্রধান বৈশ্বিক কেন্দ্র ছিল। এরপর বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প এবং ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দরে বাকি সমস্ত পণ্য খালাস করা হলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটল ফিরতি কার্গো নিয়ে। ইউরোপের কোনো বন্দর থেকেই বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত কোনো পণ্য পাওয়া গেল না। একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে দীর্ঘদিন খালি বসিয়ে রাখা মানে কোম্পানির বিপুল আর্থিক ক্ষতি। তাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলো—পুরো খালি জাহাজ হাঁকিয়ে আমাদের চলে যেতে হবে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী ইরানের বন্দর শাহপুরে।
ইউরোপ থেকে খালি জাহাজে সাগরের উত্তাল ঢেউ সামলে পৌঁছালাম বন্দর শাহপুরে। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, বাংলাদেশের রাসায়নিক ও সার কারখানার কাঁচামাল হিসেবে জাহাজে লোড করা হবে বিপুল পরিমাণ দানাদার সালফার বা গন্ধক। ইউরোপের কোনো রিটার্ন কার্গো না পাওয়ার কারণেই কর্তৃপক্ষ দূরবর্তী এই পথ বেছে নিয়েছিল। বন্দর শাহপুরের সেই সালফার লোডিংয়ের স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলব না। কার্গো হোল্ডে যখন ক্রেন দিয়ে শুকনো হলুদ সালফার ঢালা হচ্ছিল, তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আর সূক্ষ্ম সালফার ধূলিকণা। সেই হলুদ গুঁড়ো বাতাসে উড়ে এসে নাবিকদের চোখ, নাক আর গলায় বিঁধত। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ত, তীব্র জ্বালাপোড়ায় ডেক ডিউটি করা যেন এক দুঃসহ শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই কষ্টকর অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে বিষাক্ত হলুদ ধূলি গায়ে মেখে জাহাজ আবার ভেসে পড়ল ভারত মহাসাগরের জলে। এই কষ্টসাধ্য কার্গো নিয়ে আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারিত ছিল চট্টগ্রামের টিএসপি সার কারখানার নিজস্ব জেটি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে জাহাজ এসে ভিড়ল কর্ণফুলীর তীরে। ১৯৭৮ সালের ২২শে জুন টিএসপি জেটিতে সালফার খালাস সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল ‘বাংলার আশা’র দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার।
চালনার উল্টো স্রোতে কাঠের খটকা
এই দীর্ঘ সফরের পর বাংলার আশা জাহাজে আমার আরেকটি ছোট্ট অথচ দারুণ উপভোগ্য তৃতীয় ভয়েজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেটি ছিল চট্টগ্রাম থেকে পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। চট্টগ্রামের বন্দর থেকে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাত সামুদ্রিক মাছের চালান নিয়ে আমরা পৌঁছালাম মালয়েশিয়ায়। সেখানে মাছের চালান নামিয়ে দিয়ে আমাদের জাহাজের খোলে বোঝাই করা হলো উন্নত মানের কাঠ। মালয়েশিয়া থেকে কাঠবোঝাই করে আমাদের জাহাজ এবার সরাসরি যাত্রা করল খুলনার চালনা বন্দরের পানে।
চালনার পশুর নদীতে যখন জাহাজ ঢুকছে, তখন আমার মনের ভেতর এক দারুণ কৌতুক আর খটকা জেগে উঠল। ছোটবেলা থেকেই ভূগোল আর বাস্তব অভিজ্ঞতায় জেনে এসেছি—খুলনার চালনা ও সংলগ্ন সুন্দরবন অঞ্চল তো কাঠ আর বনজ সম্পদের জন্যই জগদ্বিখ্যাত! সেই চালনা বন্দরের জেটিতেই কিনা বিদেশ থেকে কাঠ বয়ে নিয়ে এসে খালাস করতে হচ্ছে! বিষয়টি নিয়ে জাহাজের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে হাসাহাসি করলাম। পরে অবশ্য জানলাম, সুন্দরবনের সাধারণ গোলপাতা বা পশুর-সুন্দরী কাঠের তুলনায় এই কাঠগুলো ছিল বিশেষ রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত সিজন কাঠ, যা আসবাবপত্র ও বিশেষ নির্মাণের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছিল। এই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যবনিকাপাত ঘটেছিল ‘বাংলার আশা’ জাহাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আমার জীবনের এক রোমাঞ্চকর ও স্মৃতিময় অধ্যায়ের।