Home অপরাজিতা সিলেটে নারী পর্যটক হেনস্তা: তীব্র ক্ষোভ, সালিশি বিচারে অসন্তোষ

সিলেটে নারী পর্যটক হেনস্তা: তীব্র ক্ষোভ, সালিশি বিচারে অসন্তোষ

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সিলেটের গোয়াবাড়ী এলাকার একটি চা-বাগানে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তাঁর ছোট বোনদের সামনে দীর্ঘ পথ জুড়ে উত্যক্ত ও হেনস্তার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্তরের নারী ও তরুণীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

অভিযুক্তদের পুলিশে না দিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী এবং সাধারণ নারীদের মধ্যে এক ধরনের নেগেটিভ ধারণা ও গভীর নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও শঙ্কা

ঘটনার শিকার তরুণী ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় রাজধানীর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রীদের মধ্যে এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, “ভিডিওটি দেখার পর নিজেকে ওই তরুণীর জায়গায় কল্পনা করে শিউরে উঠেছি। প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা তিনটি মেয়েকে এভাবে হ্যারেজ করা হলো, অথচ আশপাশের কেউ এগিয়ে এল না? সবচেয়ে অবাক লেগেছে এটা শুনে যে, পুলিশ ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই স্থানীয়ভাবে সালিশ করে অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা তো অপরাধকে এক প্রকার লাইসেন্স দেওয়া। এরপর কোনো মেয়ে কি একা বা বন্ধুদের সাথে দেশের কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সাহস পাবে?”

বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সামিয়া হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফেসবুক পোস্টে ওই আপু লিখেছেন—’এভাবেই কি সিলেটে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়?’ এই কথাটা আমাদের সবার বুকে লেগেছে। আমরা যারা ট্রাভেল করতে পছন্দ করি, তারা এখন সিলেটে যাওয়ার আগে দশবার ভাবব। স্থানীয় প্রশাসন যদি পর্যটন স্পটগুলোতে নারীদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে পর্যটন খাতের এই ক্ষতি কেউ পূরণ করতে পারবে না।”

 রাজধানীর কর্মজীবী নারীদের মতে, কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই ছুটির দিনে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঢাকার বাইরে ঘুরতে যান। কিন্তু এই ঘটনা তাঁদের সেই স্বাধীনতায় বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত তানজিলা আক্তার বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত ঘরের বাইরে লড়াই করছি। একটু শান্তির জন্য যখন দেশের ভেতরে কোথাও ঘুরতে যাব, সেখানেও যদি এভাবে এক কিলোমিটার পথ ধাওয়া করে হেনস্তা করা হয়, তবে আমরা যাব কোথায়? আর সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার করাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ফৌজদারি অপরাধ, এর বিচার আইনি প্রক্রিয়াদ্বারা হওয়া উচিত ছিল। এই দুর্বল সিদ্ধান্তের কারণে অপরাধীরা আরও পার পেয়ে যাবে।”

সাধারণ নারীদের মাঝে উদ্বেগ

রাজধানীর সাধারণ গৃহিণী ও সাধারণ নারীদের মধ্যেও এই ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই এখন তাঁদের কন্যাসন্তান বা পরিবারের তরুণী সদস্যদের ঢাকার বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও গৃহিণী মরিয়ম বেগম বলেন, “আমার দুই মেয়ে কলেজে পড়ে। ওদের বন্ধুদের সাথে সিলেট যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এই ভিডিও দেখার পর আমি পরিষ্কার মানা করে দিয়েছি। যে দেশে তিন বোন একসাথে ঘুরেও একদল বখাটের হাত থেকে রেহাই পায় না, সেখানে মেয়েদের একা ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। স্থানীয় অভিভাবকরা কীভাবে বখাটেদের পুলিশে না দিয়ে জিম্মায় নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন, তা আমার বোধগম্য নয়।”

নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি রাজধানীর সচেতন নারী সমাজের দাবি, কেবল সিলেটের এই ঘটনাই নয়, দেশের প্রতিটি পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। লোকদেখানো সালিশি ব্যবস্থা বন্ধ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নারী দেশের কোথাও গিয়ে নিজেকে এতটা অসহায় বোধ না করেন।

সিলেটের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন এলাকায় নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ নিয়ে আপনাদের মতামত কী? আমাদের ফেসবুক পেজে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানান এবং দেশের সর্বশেষ খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন।