বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা, শুল্কায়নে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতায় আমদানিকারকদের ব্যবসা পরিচালন ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আসছে না শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে শুল্কায়ন সহজীকরণ, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত ও ব্যবসার ব্যয় কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এর প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)।
১২ জুলাই (রবিবার) এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক জরুরি পত্রে এই আহ্বান জানান চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
চেম্বার সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, কাস্টমস ও বন্দর প্রতিনিধিদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসা পরিচালন সহজীকরণের লক্ষ্যে ৪ দিনের মধ্যে পণ্য শুল্কায়ন সম্পন্ন ও খালাসের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। একই সাথে বন্দরের গতিশীলতা বৃদ্ধি ও জট কমাতে অচল স্ক্যানার মেশিন সচল করারও নির্দেশ দেন তিনি। তবে অর্থমন্ত্রীর এই স্পষ্ট নির্দেশনার পরও কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্বদিচ্ছার অভাব, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও অকারণ দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বন্দর ব্যবহারকারীরা এর সুফল পাচ্ছেন না।
এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেওয়া পত্রে চেম্বার সভাপতি কাস্টমস হাউজের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, কন্টেইনার স্ক্যানিং সম্পন্ন হওয়ার পরও ‘গোপন সংবাদ’-এর অজুহাতে পুনরায় কায়িক পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে রাসায়নিক পরীক্ষার সুযোগ থাকার পরও ল্যাব টেস্টের নামে পণ্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ই-সিও’ (e-CO) দাখিল করার পরও সিগনেচার যাচাইয়ের নামে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। এছাড়া কন্টেইনার আনস্টাফিংয়ের সময় অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং বাধ্যতামূলক নয় এমন পণ্যকেও বিএসটিআই টেস্টে পাঠিয়ে অকারণ জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে ৪ দিনের নির্দেশনা থাকলেও পণ্য খালাসে ৭ থেকে ৮ দিন বা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, একই পণ্যের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক বারবার কায়িক পরীক্ষার কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পণ্য আনস্টাফিং করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য বাজারে বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ায় আমদানিকারকরা বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি কাস্টমস আইন ২০২৩-এ পেপারলেস কাস্টমস, প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং ও রিস্ক বেইজড এক্সামিনেশনের মতো আধুনিক ব্যবস্থার ঘোষণা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। বিদ্যমান বিধিমালা উপেক্ষা করে লোডিংয়ের মাধ্যমে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করায় পুরো প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আমদানিকারকরা বলছেন, খালাস কার্যক্রমে বিলম্বের কারণে একদিকে ডেমারেজ বা অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে টেস্ট ও নথিপত্রের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়ে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ ভোক্তা ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর।
দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাস্টমস শুল্কায়ন প্রক্রিয়াকে অনতিবিলম্বে আধুনিক ও সহজ করার জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই বাণিজ্য সংগঠন।