বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথ লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকটের অভিঘাত আছড়ে পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে। সুয়েজ ক্যানাল এড়িয়ে বাণিজ্য জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ‘কেপ অব গুড হোপ’ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে। ভৌগোলিক দূরত্বের এই বাধ্যবাধকতা পুরো বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন ব্যয়বহুল ও জটিল ঘূর্ণাবর্তে ফেলেছে। অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, ক্রু পরিচালন খরচ, চড়া বিমা প্রিমিয়াম এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কারণে কার্যকর জাহাজ ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্রেইট রেটের পারদ এখন আকাশচুম্বী।
স্বাভাবিক সময়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সংক্ষিপ্ততম পথ হিসেবে সুয়েজ ক্যানাল ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঝুঁকি এড়াতে প্রধান প্রধান গ্লোবাল শিপিং লাইন পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ দিয়ে ঘুরতি পথে চলাচলের কারণে একেকটি জাহাজের গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন বা তারও বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে।
এই বাড়তি পথ পাড়ি দিতে প্রতিটি ট্রিপে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়াতে হচ্ছে। পাশাপাশি বর্ধিত দিনগুলোর জন্য জাহাজের ক্রু ভাতা, অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ, যুদ্ধঝুঁকি বাবদ উচ্চ বিমা প্রিমিয়াম (War Risk Surcharges) এবং নিরাপত্তা ব্যয় যুক্ত হয়ে পরিচালন খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস বিশ্লেষকদের মতে, রুট পরিবর্তনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অদৃশ্য প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী জাহাজের কার্যকর ধারণক্ষমতার (Effective Vessel Capacity) ওপর। একটি জাহাজ আগে যে সময়ে একটি নির্দিষ্ট ট্রেডিং রোটেশন সম্পন্ন করে নতুন চালানের জন্য প্রস্তুত হতো, এখন দীর্ঘ যাত্রার কারণে সেটি সাগরে আটকে থাকছে অনেক বেশি দিন। ফলে বিশ্বে মোট জাহাজের সংখ্যা একই থাকা সত্ত্বেও বাজারে কার্যত কন্টেইনার জাহাজের মারাত্মক ঘাটতি বা টাইট সাপ্লাই তৈরি হয়েছে। একদিকে জাহাজের সংকট, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের চাহিদা—এই দুইয়ের চাপে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে কন্টেইনার ফ্রেইট রেট।
বিএসএএ নেতৃত্বের বিশ্লেষণ ও সতর্কবার্তা
লোহিত সাগর সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানি-রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ)-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, “লোহিত সাগরের ভূরাজনৈতিক সংঘাত কোনো আঞ্চলিক ঘটনা নয়, এটি আন্তর্জাতিক শিপিং বাণিজ্যের স্নায়ুকেন্দ্রে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। সুয়েজ ক্যানাল ছেড়ে কেপ অব গুড হোপ হয়ে জাহাজ চালানো মানে শুধু সময় বৃদ্ধি নয়, বরং জাহাজ মালিকদের পরিচালন খরচ এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। অতিরিক্ত জ্বালানি আর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দৃশ্যমান জাহাজ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো যখন আন্তর্জাতিক ফ্রেইট রেট বাড়াতে বাধ্য হয়, তখন তার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় আমাদের মতো দেশকে। বাংলাদেশের কাঁচামাল আমদানি এবং ইউরোপ-আমেরিকায় তৈরি পোশাক রপ্তানি উভয়ই এই রুট ও ফ্রেইট খরচের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই বৈশ্বিক সংকট আমরা এককভাবে থামাতে পারব না, তবে আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ও বাড়তি অভ্যন্তরীণ চার্জ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে চাপ সামাল দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।”
শিপিং ম্যাগনেট ও অপারেটরদের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী একাধিক শীর্ষস্থানীয় ফিডার ও মাদার ভেসেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি বিরূপ আবহাওয়ার মুখে জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি এবং শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা বাড়ছে।
দেশীয় শিপিং খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা ও কন্টেইনার ফ্রেইট খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বৈশ্বিক শিপিং বাজার পুরোপুরি চাহিদা ও জোগানের নিয়মে চলে। সুয়েজ খাল বন্ধপ্রায় হওয়ার কারণে যে কৃত্রিম জাহাজ সংকট ও কন্টেইনার ভারসাম্যহীনতা (Container Imbalance) তৈরি হয়েছে, তাতে শিপিং লাইনগুলোর পরিচালনা মার্জিন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি ফ্রেইট ও সারচার্জ আরোপ করতে বাধ্য হচ্ছে।
শিপিং খাতের অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইনে এর ধাক্কা তত গভীর হবে। জাহাজের শিডিউল বিপর্যয় এবং উচ্চ ফ্রেইট খরচের কারণে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










