তারেক রহমানের কণ্ঠ একসময় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল—যা বাংলাদেশের মতো ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের একটি দেশের সম্ভাব্য নেতার ক্ষেত্রে মোটেও স্বাভাবিক বা আদর্শ ঘটনা নয়। এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত আছে এক ধরনের বিদ্রূপও। কারণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তৃতা প্রচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে ঠিক এইভাবেই তাদের প্রতিবেদন শুরু করেছে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম— ‘বাংলাদেশ’স প্রোডিগাল সন’। এতে বলা হয়, দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছেন। দেশে ফেরার পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হিসেবে টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গেই কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি এখনও দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। নিজের বাসভবনের সামনে বসেই তিনি এ সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে চারপাশে ছিল বাগানবিলাস ও গাঁদা ফুলে ঘেরা পরিবেশ। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, তিনি খুব ভালো বক্তা নন; তবে কোনো দায়িত্ব দিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তা পালনের চেষ্টা করেন।
গত কয়েক সপ্তাহ তারেক রহমানের জীবনে ছিল একেবারেই ঝড়ো সময়। গত ২৫ ডিসেম্বর লাখো মানুষের উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশে ফেরেন। এর ঠিক পাঁচ দিন পরই দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর মারা যান তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। রাজধানীতে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। এই স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে তারেক রহমানের। তিনি বলেন, তার হৃদয় তখন ভীষণ ভারী হয়ে আছে। তবে তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— দায়িত্ব এলে তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না, পালন করতেই হয়।
সম্ভবত সেই দায়িত্বই এখন তারেক রহমানকে তার মায়ের রাজনৈতিক পথ অনুসরণে নিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন একটি সেতুবন্ধন হিসেবে—যার এক প্রান্তে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি, আর অন্য প্রান্তে তরুণ বিপ্লবীদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা।
দেশের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়, যেগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল মুদ্রা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহে। এসব প্রতিবন্ধকতা পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকে অত্যন্ত জরুরি করে তুলেছে।
অনেকের মতে, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ও যোগ্যতা তার পারিবারিক উত্তরাধিকার—তিনি খালেদা জিয়া এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র। তবে বাস্তবতা হলো, বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি তাকে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত। ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, বিএনপির প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন সেখানে ১৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশও। পাশের দেশ মিয়ানমারে সংঘটিত গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা এক কোটিরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ হাইটেক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে, যাতে স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। অন্যদিকে, চীনও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে আগ্রহী।
অনেকের প্রত্যাশা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সূচিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো ভবিষ্যতে আবার স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। তারেক রহমান বলেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
-সংগৃহীত










