আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হেনেছে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই জোড়া ভূকম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এই দুর্যোগকে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করে সতর্ক করেছে যে, এই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রাণহানি ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। তবে ঘটনার ১৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দেশটিতে এখনো হতাহতের সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
জোড়া ভূমিকম্পের আঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি স্থানীয় সময় গত বুধবার (২৪ জুন) বিকেল ৫:০৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ১০:০৪ মিনিট) ভেনেজুয়েলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ারাকুই রাজ্যের ভেরোয়েস পৌর এলাকায় প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়। ৭.২ মাত্রার এই প্রাথমিক ধাক্কার মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের মধ্যে একই এলাকায় ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় এবং প্রধান ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছে। ভূকম্পনটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর তীব্রতা প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া এবং ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্পের ফলে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে রাজধানী কারাকাসে। দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী ডিওসডাডো ক্যালো জানিয়েছেন, কারাকাসের আলতামিরা এবং লস পালোস গ্রান্দেসসহ বেশ কিছু এলাকায় একাধিক বহুতল আবাসিক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। কারাকাসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রায় সবকটি উঁচু ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাস্তাঘাটে ধুলো ও ধ্বংসস্তূপের স্তূপ জমে গেছে।
১৪ ঘণ্টা পরেও হতাহতের সংখ্যা না জানার কারণ
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের ১৪ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও সরকারিভাবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা না পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা:
১. যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া ও তথ্য নিয়ন্ত্রণ: ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল এবং রাজধানী কারাকাসসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য নিয়ন্ত্রণের (মিডিয়া ব্ল্যাকআউট) একটি আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যার কারণে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে আসতে সময় লাগছে।
২. ধ্বংসস্তূপের বিশাল আকার ও উদ্ধারকাজের জটিলতা: কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য বহুতল আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে মাটির সাথে মিশে গেছে। শত শত টন ওজনের কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে ঠিক কত মানুষ আটকে আছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা অসম্ভব। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উদ্ধারকাজ চালাতে হচ্ছে, যাতে ভেতরে জীবিত থাকা ব্যক্তিরা আঘাত না পান।
৩. ছুটির দিনের কারণে হিসাবের জটিলতা: বুধবার ভেনেজুয়েলায় একটি জাতীয় ঐতিহাসিক ছুটির দিন (Battle of Carabobo) ছিল। ছুটির কারণে সাধারণ মানুষ কর্মক্ষেত্রে না গিয়ে সবাই নিজ নিজ পরিবারসহ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। বহুতল ভবনগুলো পূর্ণ থাকায় ভেতরে থাকা মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. জরুরি সেবার স্থবিরতা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা: লা গুয়াইরা অঞ্চলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সব ধরনের বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে। কারাকাসের মেট্রো ও রেল যোগাযোগ স্থগিত রাখা এবং গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ এড়াতে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসকদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। তদুপরি, ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থল সান ফেলিপে ও ইউমারে অঞ্চলের পাহাড়ি ও গ্রামীণ সড়কগুলো ধসে পড়ায় সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো উদ্ধারকারীদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি ভয়াবহ এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। উপকূলীয় এলাকায় প্রথমে সুনামি সতর্কবার্তা জারি করা হলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসন, উদ্ধারকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ধসে পড়া ভবনগুলোর নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। ভেনেজুয়েলার জরুরি বিভাগ এখন পর্যন্ত কেবল স্থানীয় পর্যায়ে চাকাও (Chacao) মিউনিসিপ্যালিটিতে কিছু মৃত্যুর খবর এবং ফ্যালকন রাজ্যে ১৫ জন আটকে থাকার মতো আংশিক তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছে। উদ্ধারকাজ যত এগোবে, সামগ্রিক হতাহতের চিত্রটি তত পরিষ্কার হবে।
নিয়মিত সংবাদ ও খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাদের সাথে শেয়ার করুন।