Home চট্টগ্রাম রাতভর ৬০টি সরকারি গাড়ির পাহারা! কার জন্য এই আয়োজন ছিল?

রাতভর ৬০টি সরকারি গাড়ির পাহারা! কার জন্য এই আয়োজন ছিল?

ছবি এ আই

 ফাঁস করলেন সাবেক আমলা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম:
আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। রাত গভীর হচ্ছে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ব্যারাকের সামনে তিল ধারণের জায়গা নেই। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ৬০ থেকে ৭০টি গাড়ি। এর মধ্যে অনেকগুলোই নীল বাতিওয়ালা দামি সরকারি গাড়ি। ভেতরে বসে আছেন বড় বড় আমলা, ব্যবসায়ী আর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা।
কীসের এই জমায়েত? কোনো জরুরি রাষ্ট্রীয় সভা? না। এক প্রভাবশালী মদ ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার এক নজিরবিহীন ‘তদবির উৎসব’!
সাবেক অতিরিক্ত সচিব
মাহবুব কবির মিলন। ১৯৯২ সালে।
তাঁর সাম্প্রতিক এক ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছেন চাকুরি জীবনের শুরুর সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা। যা পড়লে বর্তমান বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের কঙ্কালটা বেরিয়ে আসে।
ঘটনার শুরু যেখানে:
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের এক নামকরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও ভেতরে চলত অবৈধ বিদেশি মদের রমরমা ব্যবসা। তৎকালীন সহকারী কমিশনার মাহবুব কবির মিলনের ওপর দায়িত্ব পড়ল অভিযানের। অথচ সেই দোকান থেকেই তিনি নিজে নিয়মিত বাজার করতেন, মালিকের সাথে ছিল চমৎকার সম্পর্ক। কিন্তু কর্তব্য পালনে তিনি ছিলেন পাথরের মতো শক্ত। তাঁর ভাষায়— “কাজের ক্ষেত্রে আমি বাপ-মাকেও চিনি না।”
যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নামে অপরাধীকে বাঁচাতে
অভিযানে মালিক গ্রেফতার হলেন। উদ্ধার হলো বিপুল মদ। কিন্তু আসল নাটক শুরু হলো ব্যারাকে আসামিকে নেওয়ার পর। মিলনের বর্ণনায়:
শহরের সব প্রশাসনিক অফিসের প্রধানরা ফোন দিতে শুরু করলেন।
ঢাকার সচিবালয় থেকে শুরু করে মন্ত্রীদের আত্মীয়-স্বজন—তদবিরের যেন বন্যা বয়ে গেল।
এক আসামিকে ছাড়াতে সারারাত ব্যারাকের সামনে ধর্ণা দিলেন রাষ্ট্রের বড় বড় কর্তারা।
একজন সৎ কর্মকর্তার উত্তর কী ছিল? তিনি কোনো ফোন ধরেননি, কোনো হুমকি শোনেননি। পরদিন ঠিকই মামলা দিয়ে আসামিকে জেলহাজতে চালান করে দেন।
সততার পুরস্কার: ৩ দিনে বদলি!
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি হাত দেন এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর বন্ধুর বিয়ারের ট্রাকে। প্রায় সাড়ে নয় হাজার ক্যান বিয়ারসহ ট্রাক জব্দ। ফোন আসছিল অবিরাম— ‘ছেড়ে দাও, নাহলে দেখে নেওয়া হবে’।
“সবাই দেখে নিলেন আমাকে। তিন দিন পরেই চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল বদলির আদেশ পেলাম।”— মাহবুব কবির মিলনের এই ছোট্ট বাক্যটি বলে দেয় কেন এ দেশে সৎ অফিসাররা টিকে থাকতে পারেন না।
৩০ বছরের নিঃসঙ্গ লড়াই
পুরো চাকুরি জীবনে তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতার অন্যায় আদেশ মানেননি, বস্তা ভরে ডিও লেটার ডাস্টবিনে ফেলেছেন। এমনকি নিজ গ্রামবাসী বা আত্মীয়-স্বজনকেও কোনো অবৈধ সুবিধা দেননি বলে আজ সবাই তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।
তাঁর শেষ উপলব্ধিটি অত্যন্ত ভয়ানক এবং শঙ্কার: “আমলা ঠিক হলে দূষিত রাজনীতি ঠিক হতে বাধ্য। সরকারি কর্মকর্তা যখন দলবাজ হয়, তখন ফেরেশতাও আর পারবে না দেশকে ঠিক করতে। সো, আমরা অনায়াসেই বলতে পারি, কেয়ামত পর্যন্ত এই দেশ আলোর মুখ দেখবে না।”
 কেন এই পোস্টটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা?
১. সিস্টেমের পচন: অপরাধীকে ধরতে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট লাগে না, অপরাধীকে বাঁচাতে যখন পুরো প্রশাসন এক হয়—সেটাই বড় সংকট। ২. মেরুদণ্ড সোজা রাখার সাহস: মাহবুব কবির মিলন দেখিয়ে গেছেন একা লড়াই করেও মাথা উঁচু করে অবসরে যাওয়া সম্ভব। ৩. নবীনদের শিক্ষা: সরকারি চাকরিতে যারা নতুন আসছেন, তাদের জন্য এটি একটি ‘এসিড টেস্ট’। আপনি কি দেশপ্রেমিক হবেন, নাকি তদবিরের দাসে পরিণত হবেন?
প্রিয় পাঠক, আপনার কী মনে হয়? আমাদের আমলাতন্ত্র কি কখনো দলবাজি মুক্ত হয়ে দেশের কথা ভাববে? নাকি মাহবুব কবির মিলনের আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে?

(পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন। সত্য কথাগুলো সবার জানা প্রয়োজন।)