Home First Lead চরের কুঁড়েঘর থেকে জাতীয় গ্রিড: সৌর বিদ্যুতের নীরব বিপ্লব

চরের কুঁড়েঘর থেকে জাতীয় গ্রিড: সৌর বিদ্যুতের নীরব বিপ্লব

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে। বাংলাদেশও এই আলোচনার বাইরে নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নীরব রূপান্তর ঘটাচ্ছে সৌর বিদ্যুৎ বা সোলার এনার্জি। প্রত্যন্ত অফ-গ্রিড গ্রাম থেকে শুরু করে মেগা সোলার পার্ক—সবখানেই এখন সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধুম লেগেছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র: অফ-গ্রিড চরের আলো ও গ্রিডের মেগা প্রজেক্ট
বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের বিকাশকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা: অফ-গ্রিড এবং অন-গ্রিড।একসময় দেশের যেসব চরাঞ্চল বা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জাতীয় গ্রিডের খুঁটি পৌঁছানো ছিল কল্পনাতীত, সেখানে আলো ফুটিয়েছে ‘সোলার হোম সিস্টেম’ (SHS)। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও ইডকলের (IDCOL) সমন্বিত উদ্যোগে দেশের প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি পরিবারে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল কিংবা রাঙামাটির পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা এখন সোলার প্যানেলের কল্যাণে রাতে ব্যবসা করছেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে, শুধু ঘরের আলো জ্বালানোই নয়, এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনেও সোলার এনার্জি বড় ভূমিকা রাখছে। ময়মনসিংহের সুতিয়াখালি, কক্সবাজারের টেকনাফ, সিরাজগঞ্জ এবং কাপ্তাইসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় সোলার পার্ক স্থাপিত হয়েছে। এসব পার্ক থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে, যা গ্রীস্মকালের পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা পূরণে সরাসরি অবদান রাখছে।
নীতিনির্ধারণী লক্ষ্যমাত্রা ও মাঠের বাস্তবতা
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ক্লিন এনার্জির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার কথা রয়েছে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বর্তমান উৎপাদন এখনো বেশ কিছুটা পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গ্রিড লাইনের আধুনিকায়নের ধীরগতি এবং উন্নত প্রযুক্তির ইনভার্টারের অভাব এই খাতের গতি কিছুটা শ্লথ করে রেখেছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সোলার প্যানেলের দাম কমতে থাকায় এবং স্থানীয় বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় বিনিয়োগের গ্রাফ এখন ঊর্ধ্বমুখী।
জমির সংকট ও ভাসমান প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় সোলার পার্কের জন্য একখণ্ড অকৃষি জমি পাওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত সাড়ে তিন থেকে চার একর জমির প্রয়োজন হয়। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশীয় প্রকৌশলীরা এখন বিকল্প ভাবছেন।
কাপ্তাই লেকের মতো বড় জলাশয়ে কিংবা বিভিন্ন সোলার পার্কের পুকুরে ‘ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ’ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। একই সাথে কৃষি জমিতে সোলার প্যানেল উঁচুতে রেখে নিচে ছায়াযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট কিছু ফসল চাষের পাইলট প্রজেক্টও শুরু হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমদানিকৃত কয়লা, এলএনজি ও তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যদি দেশীয় এই সৌর শক্তিকে শতভাগ কাজে লাগানো যায়, তবেই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আরও নানা বিষয় জানত ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com