Home অন্যান্য মিথ্যার মায়াজাল: কেন মানুষ অকারণে অবলীলায় মিথ্যা বলে?

মিথ্যার মায়াজাল: কেন মানুষ অকারণে অবলীলায় মিথ্যা বলে?

  • অকারণ মিথ্যা বলা অনেক সময় ‘মিথোম্যানিয়া’ বা প্যাথলজিক্যাল লায়িংয়ের লক্ষণ।
  • মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সে হোয়াইট ম্যাটারের আধিক্য এই প্রবণতা বাড়াতে পারে।
  • শৈশবের নিরাপত্তাহীনতা বা মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এই অভ্যাসের জন্ম হয়।
  • মিথ্যাবাদীরা নিজেদের তৈরি কাল্পনিক জগতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
আড্ডার মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন সুমিত সাহেব। চায়ে চুমুক দিয়ে অবলীলায় বলছেন, “জানেন, গত মাসে যখন প্যারিসে গেলাম, আইফেল টাওয়ারের ওপর এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সাথে আমার ডিনার হলো।” অথচ অফিসের সবাই জানে, সুমিত সাহেব গত মাসে অসুস্থতার ছুটিতে গ্রামেই ছিলেন।
তিনি এমনভাবে বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কারোরই সন্দেহ করার জো নেই। এই যে প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে, এমনকি অবান্তর বিষয়েও সত্যের সাথে কল্পনার মিশেল দেওয়া—একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্যাথলজিক্যাল লায়িং’ (Pathological Lying) বা ‘মিথোম্যানিয়া’।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ বদভ্যাস নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি মানসিক জটিলতা। সাধারণ মানুষ যেখানে কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মিথ্যা বলে, এই ধরনের মানুষরা কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মিথ্যা বলতে থাকে।
এদের মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাথলজিক্যাল লায়ারদের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশে সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি ‘হোয়াইট ম্যাটার’ (White Matter) থাকে। এই হোয়াইট ম্যাটার অধিক হওয়ার কারণে তারা খুব দ্রুত একের পর এক মিথ্যার জাল বুনতে পারে এবং নিজের বলা মিথ্যাকেও সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘কগনিটিভ এম্প্যাথি’র ভিন্নতর ব্যবহার।
সামাজিকভাবে এর শিকড় অনেক সময় প্রোথিত থাকে শৈশবে। যারা ছোটবেলায় কঠোর শাসনে বড় হয়েছে বা পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি, তারা নিজেদের চারপাশে একটি কাল্পনিক সুরক্ষা বলয় তৈরির জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ক্রমে এটি নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়। তারা যখন কারো সাথে কথা বলে, তখন সামনের মানুষটিকে নিয়েও আজগুবি গল্প ফাঁদতে দ্বিধা করে না।
কারণ, তাদের অবচেতন মন চায় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতাবান হিসেবে জাহির করতে। এটি পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের বিকারের একটি অংশ হতে পারে, যেখানে রোগী নিজের তৈরি করা মিথ্যার জগতে বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তবে এই মিথ্যার পরিণাম সব সময় সুখকর হয় না। গল্পের সেই সুমিত সাহেবের মতো অনেক মিথ্যাবাদীই কোনো একদিন এমন এক জালে আটকে যায়, যা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন একের পর এক মিথ্যা ধরা পড়তে শুরু করে, তখন তারা সামাজিক ও পেশাগতভাবে ‘মহাবিপদে’ পড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি নিরাময়যোগ্য। বিহেভিয়ারাল থেরাপি এবং সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এই মিথ্যার নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে সবার আগে প্রয়োজন রোগটির অস্তিত্ব স্বীকার করা, কারণ মিথ্যাবাদীরা অধিকাংশ সময় নিজেদের অসুস্থ বলে মানতেই চায় না।

আরও নানা বিষয় জানতে ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com