বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বৈশ্বিক ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতেও আয়ের উৎসে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন বা প্যারাডাইম শিফট ঘটেছে। একসময় দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর আয়ের সিংহভাগ প্রথাগত ভয়েস কল (মিনিট কেনা বা সাধারণ কল) থেকে আসলেও, বর্তমানে ইন্টারনেট বা ডাটা সেবা একক খাত হিসেবে আয়ের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, থ্রি-জি থেকে ফোর-জি এবং সাম্প্রতিক ফাইভ-জি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও গ্রাহকদের জীবনযাত্রার ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ‘মর্ডর ইন্টেলিজেন্স’ (Mordor Intelligence) এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক টেলিকম বাজারে সেবাভিত্তিক আয়ের ৪৪ শতাংশেরও বেশি (৪৪.০২%) এখন আসছে কেবল ডাটা এবং ইন্টারনেট সার্ভিস থেকে। অন্যদিকে প্রথাগত ভয়েস কলের একক আধিপত্য প্রতি বছরই সংকুচিত হচ্ছে।
ডাটা ব্যবহারে রেকর্ড এবং আয়ের রূপান্তর
টেলিকম খাতের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের শীর্ষ দুই অপারেটর গ্রামীণফোন এবং রবি আজিয়াটা লিমিটেডের গ্রাহক প্রতি গড় আয় বা এআরপিইউ (ARPU)-এর এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরাসরি ডাটা অ্যাড-অন এবং ইন্টারনেট প্যাক বিক্রি থেকে আসে।
অপারেটরদের অভ্যন্তরীণ ডেটা অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের একজন ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ৩.১ জিবি ডাটা ব্যবহার করতেন। ২০২৪-২৫ সালের শেষ নাগাদ তা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে গ্রাহক প্রতি মাসে গড়ে ৬.৪ জিবি-তে উন্নীত হয়েছে। মূলত করোনা-পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম, ফ্রিল্যান্সিং, ভিডিও স্ট্রিমিং (ইউটিউব, টিকটক, ফেসবুক রিলস) এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক প্রসারের কারণেই ডাটার এই উল্লম্ফন।
ভয়েস কল কমার প্রধান কারণ ‘ওটিটি’
গ্রাহকেরা এখন সরাসরি মোবাইল নেটওয়ার্কের মিনিট প্যাক ব্যবহার করে কথা বলার চেয়ে ইন্টারনেট ডাটা খরচ করে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা ইমোর মাধ্যমে অ্যাপ-টু-অ্যাপ ভয়েস বা ভিডিও কল করতে বেশি পছন্দ করছেন। ফলে অপারেটরদের ট্র্যাডিশনাল ভয়েস কল এবং এসএমএস (SMS) থেকে আসা রাজস্বের প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ও গ্রামীণ ডাটা বিপ্লব
স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ফোর-জি নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) জোয়ার। দেশের গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এখন কিউআর (QR) কোডের মাধ্যমে মাইক্রো-পেমেন্ট বা লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যার জন্য সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয়। ফলে যেসব অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছ থেকে অপারেটররা একসময় কেবল ভয়েস রাজস্ব পেত, এখন সেখান থেকেও বড় অংকের ডাটা রাজস্ব আসছে।
চ্যালেঞ্জের মুখেও আশাবাদী খাতসংশ্লিষ্টরা
বিটিআরসি (BTRC)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিম রেশনাকরণ এবং কঠোর বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের কারণে মাল্টিপল বা অতিরিক্ত সিম ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে মোবাইল ও ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও অপারেটরদের ডেটা থেকে আয় কমেনি। কারণ বিদ্যমান নিয়মিত গ্রাহকেরা এখন আরও বড় ও উচ্চমূল্যের ডাটা বান্ডেল বা লিমিটলেস স্পিড-ভিত্তিক ইন্টারনেট প্যাক ব্যবহার করছেন। সরকারের ডিজিটাল ইনক্লুশন এজেন্ডা এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ফাইভ-জি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা এই ডাটা-ভিত্তিক রাজস্ব খাতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।