Home অন্যান্য দুর্গম সাব্রুম থেকে দিল্লির মঞ্চ: শিক্ষকতার অনন্য দৃষ্টান্ত রঞ্জন দেবনাথ

দুর্গম সাব্রুম থেকে দিল্লির মঞ্চ: শিক্ষকতার অনন্য দৃষ্টান্ত রঞ্জন দেবনাথ

রঞ্জন দেবনাথ
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষার আলো: এক আদর্শ শিক্ষাব্রতীর মুখোমুখি
রাকেশ দেবনাথ, আগরতলা (ত্রিপুরা): শিক্ষকতাকে নিছক আট-পাঁচটার বাঁধা ধরা চাকরি বা জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে না দেখে সমাজ বিনির্মাণের এক পরম ব্রত ও পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন ত্রিপুরার সাব্রুম গার্লস দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রঞ্জন দেবনাথ। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের সাধনা, সুদূরপ্রসারী ভাবনা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভূষিত হয়েছেন ভারতের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারে। সম্প্রতি একান্ত আলাপচারিতায় এই গুণী শিক্ষক মেলে ধরলেন তাঁর শৈশবের অনুপ্রেরণা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার নানা চড়াই-উতরাই, আধুনিক শিক্ষাদর্শন এবং একজন ভালো মানুষ গড়ে তোলার দীর্ঘ সংগ্রামের বিস্তারিত ইতিবৃত্ত
শৈশবে নিজের স্কুলের শিক্ষকদের পাঠদানের আন্তরিকতা, অনন্য শৃঙ্খলা এবং স্নেহের পরশ দেখেই তাঁর মনে শিক্ষকতার প্রতি পরম ভালোবাসা জন্মেছিল। সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করেই শুরু হয়েছিল তাঁর কর্মজীবন। তাঁর মতে, সময়ের বিবর্তনে শিক্ষার ধারা আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে শিক্ষা ছিল কেবল বই, খাতা ও ব্ল্যাকবোর্ডের চার দেয়ালের ভেতরে আবদ্ধ, সেখানে আজকের আধুনিক যুগে যুক্ত হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল লার্নিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং অ্যাক্টিভিটি-ভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি। “Learning by doing” বা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা এখন মুখস্থ বিদ্যার বোঝা না টেনে আনন্দের সাথে গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে পারছে
দক্ষিণ ত্রিপুরার দুর্গম সৎচান্দ কিংবা সাব্রুম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। সেখানে প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশের পাশাপাশি উন্নত পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং গ্রামীণ অভিভাবকদের অসচেতনতা ছিল নিত্যদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে থেমে না থেকে তিনি নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং শিক্ষার পরিবেশকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। বিশেষ করে ‘PM SHRI’ প্রকল্পের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ে আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব, অটল টিঙ্কারিং ল্যাব, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক শিক্ষা (Skill Education) চালু করে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থার সংযোগ ঘটিয়েছেন তিনি
প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ক্লাসরুমের পঠনপাঠনকে তিনি সবসময় সবার ওপরে স্থান দেন। দিন শুরুর আগেই সময়সূচি নিখুঁতভাবে বণ্টন করে নিয়ে দাপ্তরিক কাজ দ্রুত নিষ্পন্ন করেন, যাতে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি শিক্ষাদানের সময়টুকু কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে খেলাধুলা, যোগব্যায়াম, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নিয়মিত বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন। এই দীর্ঘ ও অক্লান্ত যাত্রায় পেশাগত ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে হয়তো পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের নিঃশর্ত ত্যাগ, সহানুভূতি ও অদম্য প্রেরণাই তাঁকে প্রতিকূল সময়ে সাহস জুগিয়েছে
সাব্রুম গার্লস স্কুলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি রাজ্যের সুপরিচিত ‘হেনরি ডিরোজিও স্কুল’-এ শিক্ষকতা করতেন। সেখানে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব নানা পদক্ষেপের কারণে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের লাগাতার ধর্মঘট, অভিভাবকদের ক্ষোভ ও কান্নাভেজা পরিবেশ ত্রিপুরার শিক্ষাঙ্গনে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। সরকারি সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে বিদায়ের দিন তিনি অশ্রুসজল ছাত্রীদের উদ্দেশে যে আবেগঘন বার্তা দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে রাজ্যজুড়ে প্রবল আলোড়ন তোলে। সেদিন তিনি ছাত্রীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, জীবনের যেকোনো অবস্থানে পৌঁছানোর আগে সর্বাগ্রে একজন ভালো ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হতে হবে; অর্জিত জ্ঞানকে স্বার্থপরের মতো আটকে না রেখে সমাজ ও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে
বিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সমগ্র রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন। রাজ্যস্তরে নবনিযুক্ত প্রধান শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ পরিচালনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা তদারকি, এসসিইআরটি (SCERT)-এর নানা শিক্ষানীতি নির্ধারণ এবং ত্রিপুরার একমাত্র শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেল ‘বন্দে ত্রিপুরা’য় নিয়মিত পাঠদানের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো দূরদূরান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন
রাষ্ট্রপতির হাত থেকে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর এই জাতীয় সম্মাননা গ্রহণের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানান, এই স্বীকৃতি তাঁর একার নয়; এটি তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সমগ্র ত্রিপুরাবাসীর যৌথ প্রয়াসের ফসল। তাঁর বিশ্বাস, কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী যখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে বলে যে বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও নৈতিকতাই তাদের সঠিক পথ দেখিয়েছে, তখনই একজন শিক্ষকের জীবন পরিপূর্ণ স্বার্থকতা পায়। তরুণ শিক্ষাব্রতীদের উদ্দেশে তাঁর সুস্পষ্ট বার্তা হলো—শিক্ষকতাকে পেশা নয়, সমাজ গড়ার ব্রত ভাবুন; আধুনিক প্রযুক্তিকে গ্রহণ করুন কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধ যেন কখনোই ফিকে না হয়ে যায়