আন্তর্জাতিক ব্যস্ততম সমুদ্র বাণিজ্যপথ এডেন উপসাগর, ইয়েমেন উপকূল ও পশ্চিম ভারত মহাসাগরে ২০১০ সালের পর সবচেয়ে বড় হুমকির সৃষ্টি করে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সোমালি জলদস্যুরা। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র চার মাসের ব্যবধানে অন্তত ৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই করেছে সশস্ত্র পাইরেট অ্যাকশন গ্রুপগুলো (PAG)। অপহৃত বাণিজ্যিক জলযানগুলোর মধ্যে রয়েছে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও সামরিক সরঞ্জামবোঝাই সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ-আমেরিকা রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে হয়, ফলে স্থানীয় শিপিং কোম্পানি ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ শিকার তুরস্কের অস্ত্রবাহী ‘লুতুফ’ ও তেল ট্যাঙ্কার ‘সিবু ১’
গত ১৭ আগস্ট সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মারাইয়ো উপকূল থেকে চার নটিক্যাল মাইল দূরে ক্যামেরুনের পতাকাবাহী সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি লুতুফ’ (MV Lutuf) ছিনতাই করে আটজন সশস্ত্র জলদস্যু। ১৯৯৫ সালে নির্মিত ১,৪০১ ডেডওয়েট টন ওজনের এই জাহাজটিতে তুরস্কের সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য পাঠানো অত্যাধুনিক অস্ত্র, স্যাটেলাইট ও যোগাযোগ সরঞ্জাম ছিল, যা মোগাদিশুর তুর্কি ঘাঁটিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। জাহাজে থাকা ১০ জন ক্রুর মধ্যে ৬ জনই ভারতীয় নাগরিক। ছিনতাইয়ের পর জাহাজটিকে পুন্টল্যান্ডের ডাঙ্গোরোয়ো জেলার গারমাল উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তুরস্ক ড্রোন ও নৌজাহাজ মোতায়েন করেছে। এর মধ্যেই জাহাজটিতে অবস্থানরত দস্যুদের স্থানীয় মাদক ‘খাত’ সরবরাহকারী একটি নৌকায় রহস্যজনক বিমান হামলায় চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
এর পরপরই ২২ আগস্ট এডেন উপসাগরে ইয়েমেন উপকূল থেকে ২০ জন ক্রুসহ (যার মধ্যে ১৬ জন ভারতীয়) ইরিত্রিয়ার তেল ট্যাঙ্কার ‘এমটি সিবু ১’ (MT Sibu 1) কবজায় নিয়ে সোমালিয়া উপকূলের দিকে নিয়ে যায় ছয়জন সশস্ত্র দস্যু। ভারতীয় মেরিন প্রশাসন অনলাইন ‘ই-নাভিক’ প্ল্যাটফর্মে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
চার মাসে ছিনতাই হওয়া ৬টি জাহাজের সামগ্রিক চিত্র
| তারিখ | জাহাজের নাম | পতাকা | ছিনতাইয়ের স্থান | ক্রু সংখ্যা | বর্তমান অবস্থা |
| ২১ এপ্রিল ২০২৬ | এমটি অনার ২৫ (Honor 25) | পালাউ | সোমালিয়া উপকূল | ১৮ জন (অধিকাংশ পাকিস্তানি) | এখনও জলদস্যুদের হেফাজতে আটক |
| ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | এমভি সোয়ার্ড (Sward) | সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস | গ্যারাকাদ (Garacad), সোমালিয়া | অনির্ধারিত | সারবাহী জাহাজটি এখনও আটক |
| ২ মে ২০২৬ | এমটি ইউরেকা (Eureka) | টোগো | ইয়েমেন উপকূল | অনির্ধারিত | মুক্তির জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ দাবি |
| ১৭ জুলাই ২০২৬ | এমটি আসানা (Asana) | তানজানিয়া | এডেন উপসাগর (Gulf of Aden) | অনির্ধারিত | পুন্টল্যান্ড উপকূলে নোঙর করা অবস্থায় আটক |
| ১৭ আগস্ট ২০২৬ | এমভি লুতুফ (Lutuf) | ক্যামেরুন | মারাইয়ো, সোমালিয়া উপকূল | ১০ জন (৬ জন ভারতীয়) | তুরস্কের অস্ত্রবোঝাই জাহাজটি গারমালে আটক |
| ২২ আগস্ট ২০২৬ | এমটি সিবু ১ (Sibu 1) | ইরিত্রিয়া | ইয়েমেন উপকূল | ২০ জন (১৬ জন ভারতীয়) | সোমালিয়া উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে |
হুমকির প্রকৃতি ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ
জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (JMIC) ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার তথ্যমতে, অন্তত দুটি সুসংগঠিত পাইরেট অ্যাকশন গ্রুপ (PAG) উপকূল থেকে শত শত নটিক্যাল মাইল গভীরে গিয়ে আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে। সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে উত্তাল সাগরে ছোট নৌকার চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই সময়ে জলদস্যুতা স্তিমিত থাকার কথা থাকলেও, এবার প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই হামলাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। দস্যুরা এখন আর ছোট মাছ ধরার ট্রলার নয়, বরং কৌশলগতভাবে বড় তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও সামরিক সরঞ্জামবাহী কার্গো জাহাজগুলোকে নিশানা বানাচ্ছে। তারা উপকূলীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জাহাজে নিয়মিত খাদ্য, জ্বালানি ও মাদক ‘খাত’ সরবরাহ করছে, যা ক্রুদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখার সুপরিকল্পিত প্রস্তুতির স্পষ্ট প্রমাণ। পুন্টল্যান্ড প্রশাসনের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো এই কর্মকাণ্ডের পেছনে মদদ জোগাচ্ছে।
বাণিজ্যিক প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক নৌজোট ও মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়মিত টহল শিথিল হওয়ার সুযোগটি নিচ্ছে জলদস্যুরা। লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে এশিয়া-ইউরোপ মূল বাণিজ্যপথে নতুন করে চরম অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ও চট্টগ্রাম বন্দরভিত্তিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থানীয় শিপিং অপারেটর ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের জন্য বাড়তি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক প্রটোকল গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সোমালি জলদস্যুতার পটভূমি
নব্বইয়ের দশকে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার সুযোগে বিদেশি ট্রলারগুলো অবৈধভাবে সোমালিয়ার জলসীমায় মাছ শিকার ও বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা শুরু করে। নিজেদের সামুদ্রিক সম্পদ ও জীবিকা রক্ষার নামে স্থানীয় সোমালি জেলেরা অস্ত্রহাতে সংগঠিত হয়ে বিদেশি জাহাজে হামলা চালানো শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে একটি লাভজনক আন্তর্জাতিক অপরাধমূলক সিন্ডিকেটে রূপ নেয়।
যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিপণ আদায় ও জাহাজ ছাড়া হয়
দস্যুরা সাধারণ ডাকাতদের মতো মালামাল লুটের বদলে জাহাজ জিম্মি রেখে কোটি কোটি ডলারের দরকষাকষি করে। যেমন এমটি ইউরেকা জাহাজটির জন্য ইতোমধ্যে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। জাহাজ ছিনতাইয়ের পর সেটিকে উপকূলের নিরাপদ জলসীমায় নোঙর করানো হয়। এরপর পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে জাহাজ মালিক পক্ষ ও আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানির সাথে গোপনে দরকষাকষি চলে। সমঝোতা চূড়ান্ত হলে নগদ মার্কিন ডলার জলরোধী প্যাকেটে ভরে বিমান বা হেলিকপ্টার থেকে সাগরে জাহাজের ডেকে ফেলা হয়। জাহাজে থাকা ডলার গণনা ও জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ নিশ্চিত হওয়ার পরই জলদস্যুরা স্পিডবোটে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যায় এবং অপহৃত নাবিক ও জাহাজকে মুক্তি দেয়।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










