বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর তালিকাভুক্তির উদ্যোগকে ঘিরে বন্দর অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের জারি করা সরকারি বিজ্ঞপ্তির সময়সূচি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৫০টি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য দুই দিনে মোট বরাদ্দ মাত্র ১০ ঘণ্টা। এর মধ্যে ২০ ও ২৭ আগস্ট প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত (দুপুরে ১ ঘণ্টার বিরতি বাদে) ৫ ঘণ্টায় ২২৫টি করে প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে প্রতিটি আবেদনকারী সময় পাচ্ছে গড়ে মাত্র ৮০ সেকেন্ড বা ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এই নজিরবিহীন দ্রুতগতির সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও বর্তমান অপারেটরদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পণ্য ওঠানামার কাজটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক। একটি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন তাদের নিজস্ব ভারী যন্ত্রপাতি—যেমন আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, মোবাইল ক্রেন, ফর্ক লিফট ইত্যাদির মালিকানা বা লিজ সংক্রান্ত নথিপত্র, আর্থিক তারল্য, দক্ষ ডক শ্রমিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, আইএসপিএস কোডসহ আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং অতীতে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ট্র্যাক রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা। বাস্তব প্রেক্ষাপটে একজন আবেদনকারী বা তার প্রতিনিধি সাক্ষাৎকার কক্ষে প্রবেশ করে পরিচয় প্রদান ও টেবিলে ফাইলের মূলকপি উপস্থাপন করতেই অন্তত এক থেকে দুই মিনিট সময় চলে যায়। সেখানে মাত্র ৮০ সেকেন্ডে পুরো কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতার মূল্যায়ন শেষ করার বিষয়টি পুরো প্রক্রিয়াটিকে কেবল ‘লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা’ বা ‘আইওয়াশ’-এ পরিণত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের অনেকেই ধারণা করছেন, তালিকা হয়তো আগেই চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে এবং এই ম্যারাথন সাক্ষাৎকার কেবল নিয়মরক্ষার একটি প্রদর্শন।
আবেদন ফি বাবদ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অফেরতযোগ্য হিসেবে ১ লাখ টাকা করে নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই হিসাবে ৪৫০টি আবেদন থেকে কর্তৃপক্ষের তহবিলে তাৎক্ষণিকভাবে জমা পড়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের পরও প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার মূল্যায়নের কোনো সুস্পষ্ট ছাপ সময়সূচিতে দেখা যায়নি।
বর্তমান বাজার কাঠামো অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বার্থ অপারেটররা বছরে গড়ে প্রায় ৮ কোটি টাকা এবং বহির্নোঙরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার কাজ করে থাকেন। দীর্ঘ ১৮ বছর অর্থাৎ ২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে এই পুরো পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা মাত্র ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ কার্গো বার্থের ১২টি জেটিতে ১২টি প্রতিষ্ঠান এবং সাগরে লাইটারিং কাজে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। দীর্ঘদিনের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের হলেও, তড়িঘড়ি করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অপারেটর তালিকাভুক্তির পদক্ষেপে পুরো বন্দর কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা ও কারিগরি ব্যর্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বর্তমান অপারেটররা।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য এই সংকটের বহুমাত্রিক দিকটি উন্মোচন করে। বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সরওয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, শেষ মুহূর্তে বন্দর চেয়ারম্যানসহ বোর্ড কেন এমন তড়িঘড়ি করে উদ্যোগ নিচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। তার মতে, এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত কাজ; এখানে যথাযথ যোগ্যতার মূল্যায়ন ছাড়া অপারেটর লাইসেন্স দেওয়া হলে পুরো সেক্টরে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেভাবে সময়সূচি নির্ধারণ করেছেন সেভাবেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে এবং প্রার্থীদের যথাসময়ে বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন যে, এই সাক্ষাৎকারে বেশি সময় লাগার কথা নয়। পাশাপাশি তিনি পরিষ্কার করেন, তালিকাভুক্ত হওয়া মানেই বন্দরের কাজ নিশ্চিত হওয়া নয়; বরং এটি ভবিষ্যতে অপারেটর নিয়োগের দরপত্রে অংশ নেওয়ার একটি প্রাথমিক সুযোগ মাত্র।
এ বিষয়ে বার্থ অপারেটর ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম মন্তব্য করেন, রাতারাতি পণ্য পরিবহনের পরিমাণ এত বৃদ্ধি পায়নি যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে লাইসেন্স বিতরণ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আলু-পটোলের ব্যবসার মতো বন্দরে হুট করে অপারেটর হওয়ার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতেই অপারেটর চূড়ান্ত করা উচিত এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ সঠিক পথেই হাঁটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করার ইতিবাচক উদ্যোগটি মূল্যায়নের চরম সময়স্বল্পতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদূরদর্শিতার কারণে বড় ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছে। দেশের লাইফলাইনখ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার আপস করা হলে তা সার্বিক জাতীয় অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।