কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: অবকাঠামো আছে, সিগন্যাল বাতিও জ্বলে, কিন্তু প্ল্যাটফর্মে আসে না কোনো যাত্রী, থামে না কোনো ট্রেন। তীব্র জনবল-সংকট এবং লোকমাস্টার ও স্টেশন মাস্টারের অভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১১২টি রেলস্টেশন এখন পুরোপুরি বন্ধ। এসব স্টেশনে ট্রেন না থেমে সরাসরি চলে যায়, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা।
রেলওয়ের সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে মোট ৫০৪টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে ১১২টি স্টেশন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে আছে। লোকবল সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি স্টেশন বন্ধ রয়েছে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে।
রেলওয়ের অঞ্চলভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:
পশ্চিমাঞ্চল: এই অঞ্চলে মোট ২৬১টি স্টেশনের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১৮৯টি। বাকি ৭২টি স্টেশনই লোকবলের অভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
পূর্বাঞ্চল: এই অঞ্চলে মোট ২৪৩টি স্টেশনের মধ্যে চালু রয়েছে ২০৩টি এবং বন্ধ রয়েছে ৪০টি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শুধু পুরোনো স্টেশনই নয়, ঢাকা-ভাঙ্গা-যخواه নতুন রেললাইনের বেশ কিছু আধুনিক স্টেশনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নতুন ও পুরোনো ছোট স্টেশনে অবকাঠামোগত সব সুবিধা থাকার পরও ট্রেন থামানো যাচ্ছে না। কোথাও স্টেশন মাস্টার নেই, আবার কোথাও বাণিজ্যিক ট্রেনের নিয়মিত যাত্রাবিরতি বা স্টপেজ অনুমোদন করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব স্টেশনের ওপর দিয়ে ট্রেনগুলো প্রতিদিন না থেমেই গন্তব্যে চলে যায়।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, বছরের পর বছর ধরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়া এবং বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরে যাওয়ার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক স্টেশন বন্ধ থাকায় ট্রেনের ক্রসিং বা সিগন্যাল ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি সময় লাগছে, যা পরোক্ষভাবে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দ্রুত এই ১১২টি স্টেশন চালু করা না গেলে রেলের রাজস্ব যেমন কমবে, তেমনি গ্রামীণ জনপদের মানুষ রেলসেবা থেকে আরও বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
মহাপরিকল্পনায় সংকট ও সমাধানের সুপারিশসমূহ
রেলওয়ের স্টেশন বন্ধ থাকা এবং কর্মী সংকটের এই ভয়াবহ চিত্র নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদকৃত ২০-ত্রিশ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনায় (Railway Master Plan) এই সামগ্রিক সংকটের মূল কারণ এবং তা দূরীকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ ও প্রকল্প তুলে ধরা হয়েছে:
১. তীব্র কর্মী সংকট ও নিয়োগের সুপারিশ: মহাপরিকল্পনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই পর্যাপ্ত লোকবল নেই, বিশেষ করে রোলিং স্টক (ইঞ্জিন ও কোচ) রক্ষণাবেক্ষণ ও স্টেশন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে । কর্মী সংকটের কারণে রেলের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও ফিল্ড পর্যায়ে শূন্যপদের হার ২০% থেকে শুরু করে ৬০% পর্যন্ত । যদি দ্রুত দীর্ঘমেয়াদী হিউম্যান রিসোর্স প্ল্যানিং (Human Resource Planning) বা মানবসম্পদ পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মী সংখ্যা বাড়ানো না হয়, তবে আগামী ৫ বছরে এই শূন্যপদের হার ৪৪% থেকে ৭৫% পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে । মাস্টার প্ল্যানে স্টেশন ও ট্রেন সম্প্রসারণের স্বার্থে দ্রুত কর্মী নিয়োগ এবং বিদ্যমান ৫টি ওয়ার্কশপ ট্রেনিং ইউনিটের কারিগরি প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধির (প্রকল্প নং-৭৩) সুপারিশ করা হয়েছে ।
২. আধুনিক সিগন্যালিং ও রিমোট অপারেশন: স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার অন্যতম কারণ হলো সনাতন পদ্ধতির সিগন্যালিং ব্যবস্থা সচল রাখতে সার্বক্ষণিক স্টেশন মাস্টারের প্রয়োজন হয়। মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বহু স্টেশন এখনো ‘নন-ইন্টারলকড’ অবস্থায় রয়েছে, যা রুট সেটিং বা ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপচয় করে । এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে মাস্টার প্ল্যানে ‘কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং’ (CBI) সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু এবং সেন্ট্রালাইজড ট্রাফিক কন্ট্রোল (CTC) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ‘ওয়ে স্টেশন’ বা ছোট স্টেশনগুলোকে দূরনিয়ন্ত্রিত (Remote Control Operation) পদ্ধতিতে পরিচালনার জোর সুপারিশ করা হয়েছে । এর ফলে মূল স্টেশন মাস্টারের অনুপস্থিতিতেও কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক কন্ট্রোল অফিস থেকে নিরাপদে ট্রেন ক্রসিং ও সিগন্যাল পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং স্টেশনগুলো সচল রাখা যাবে ।
৩. রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণ ও ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি: ছোট স্টেশনগুলোতে ট্রেন না থামার আরেকটি কারণ হলো পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচের অভাব, যার ফলে লোকাল ও সাধারণ ট্রেনের সংখ্যা কমে গেছে। মহাপরিকল্পনার ডায়াগনস্টিক অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, রেলওয়ের একটি বিশাল অংশের রোলিং স্টক মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওভারএজ (BG লোকোমোটিভের ৩৩% এবং MG লোকোমোটিভের ৩৫% তাদের অর্থনৈতিক জীবনসীমা পার করেছে) । মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে নতুন লাইন তৈরি হলেও ওয়ার্কশপগুলোর সক্ষমতা না বাড়ালে স্টেশনগুলো সচল করা যাবে না । এ জন্য রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম ও ঈশ্বরদীতে নতুন ক্যারেজ, ওয়াগন ও ডেমু ওয়ার্কশপ নির্মাণসহ বিদ্যমান লোকো শেডগুলোর আধুনিকায়নের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে বন্ধ স্টেশনগুলোতে পুনরায় সেবা চালু করা যায় ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাপরিকল্পনার এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা না গেলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রেললাইন ও আধুনিক স্টেশন নির্মাণ করলেও লোকবল ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার অভাবে ১১২টি বন্ধ স্টেশনের তালিকা ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ হবে।