Home পর্যটন প্রমত্তা কাঁচালং এখন শীর্ণ নালা: কাপ্তাই হ্রদের মরণদশা

প্রমত্তা কাঁচালং এখন শীর্ণ নালা: কাপ্তাই হ্রদের মরণদশা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাঙামাটি: কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা সংকট এখন কেবল রাঙামাটির নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যই নয়, বরং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের তীব্রতা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার যৌথ ফল হিসেবে এই প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দৃশ্যমান হচ্ছে।
নৌ যোগাযোগে বিপর্যয় ও জনদুর্ভোগ
হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি ও নানিয়ারচরের মতো দূরবর্তী উপজেলাগুলোর সাথে জেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। যেখানে লঞ্চ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ মাধ্যম, সেখানে এখন বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে স্পিডবোট বা ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পকেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
কাঁচালং নদীর মতো এক সময়ের প্রমত্তা নদীর আজ শীর্ণ নালায় পরিণত হওয়া প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। হ্রদের তলদেশে বছরের পর বছর জমা হওয়া পলি ও পাহাড়ি ধসের মাটি অপসারণ না করায় এই কৃত্রিম মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।
অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা
যোগাযোগ বন্ধের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। রাঙামাটির দূরবর্তী উপজেলাগুলো থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য, যেমন—কলা, আনারস, কাঁঠাল ও বাঁশ সময়মতো জেলা সদরে বা দেশের অন্যত্র সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে পচনশীল পণ্য নিয়ে চাষিরা চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। দেশের একমাত্র এই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চারটিই বন্ধ থাকা জাতীয় গ্রিডের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। লোডশেডিংয়ের এই সময়ে সস্তা ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া সামগ্রিক জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
স্থায়ী সমাধান এবং ড্রেজিংয়ের চ্যালেঞ্জ
রাঙ্গামাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আগামী বর্ষা মৌসুমের পর ব্যাপক ড্রেজিংয়ের যে আশার বাণী শুনিয়েছেন, তা ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে অতীতে অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা গেছে। কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ড্রেজিং বা খনন কাজ না হওয়াটাই আজকের এই সংকটের মূল কারণ।
শুধুমাত্র লোকদেখানো বা আংশিক ড্রেজিং করে এই বিশাল হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা (Master Plan)। বর্ষার পর যখন খনন কাজ শুরু হবে, তখন যেন কেবল গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলোই নয়, বরং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানির উৎস এবং প্রধান নদীগুলোর মোহনাও খনন করা হয়—তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে রাঙামাটিকে এই একই অচলাবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

businesstoday24.com ফলো করুন