Home First Lead রেল-বন্দর রশি টানাটানি: ৬৫ বছরেও কাটেনি ভূ-জটিলতা

রেল-বন্দর রশি টানাটানি: ৬৫ বছরেও কাটেনি ভূ-জটিলতা

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দর এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে—দেশের অর্থনীতির দুই প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ গত সাড়ে ছয় দশক ধরে এই দুই সংস্থার মধ্যে চলছে এক নীরব কিন্তু তীব্র ‘ভূমি যুদ্ধ’। ১৯৬০ সালে পৃথক হওয়ার পর থেকে শুরু হওয়া এই বিরোধ ২০২৬ সালেও অমীমাংসিত। শত শত একর মূল্যবান ভূমি নিয়ে সৃষ্ট এই রশি টানাটানির কারণে স্থবির হয়ে আছে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রেলওয়ের আধুনিকায়ন প্রকল্প।
পটভূমি: এক ছাদের নিচে যখন ছিল সংসার
১৮৯৯ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ও তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে (পরবর্তীতে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে) একই প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে ছিল। মূলত রেলওয়ের একটি বিভাগ হিসেবেই বন্দর পরিচালিত হতো। ১৯৬০ সালে ‘পোর্ট ট্রাস্ট’ গঠিত হওয়ার পর প্রশাসনিক বিচ্ছেদ ঘটলেও সম্পদের ভাগাভাগি রয়ে যায় অস্পষ্ট। দু’ প্রতিষ্ঠানের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে পাঁচ যুগের বেশি সময় ধরে বিরাজমান ‘ভূমি যুদ্ধ’ এর নানা কারণ।
 বিরোধের আবর্তে যা কিছু
১. মালিকানা বনাম ভোগদখল: রেলওয়ের দাবি অনুযায়ী, বন্দরের ব্যবহৃত অনেক জমি এখনো রেলওয়ের খতিয়ানভুক্ত। অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি—অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য এই জমিগুলো ১৯৫৯ ও ১৯৮৭ সালের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বন্দরের স্বত্ব। মিউটেশন বা নামজারি না হওয়ায় এই আইনি জটিলতা কয়েক যুগেও কাটেনি।
২. সিজিপিওয়াই (CGPY) সংকট: চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড বা সিজিপিওয়াই এলাকাটি এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। বন্দর চায় এই এলাকাটি পুরোপুরি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজে ব্যবহার করতে, কিন্তু রেলওয়ে তাদের ইয়ার্ডের ওপর বন্দরের একচ্ছত্র আধিপত্য মানতে নারাজ। ফলে বন্দরের ভেতরের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
৩. লিজ বাণিজ্যের লড়াই: সল্টগোলা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এমন অনেক জমি রয়েছে যা রেলওয়ে নিজের দাবি করে তৃতীয় পক্ষকে লিজ দিয়েছে। আবার একই জমি বন্দরও নিজের দাবি করে বরাদ্দ দিয়েছে। এর ফলে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দুই সংস্থাকেই খাজনা দিচ্ছে অথবা আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে কাজ বন্ধ রেখেছে।
৪. উদ্ধারহীন অবৈধ দখল: সংস্থা দুটির সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় মাঝখানের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বস্তি ও বিশাল সব গুদাম। উচ্ছেদ অভিযানে গেলে এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে পিছু হটে, যার সুযোগ নিচ্ছে প্রভাবশালী ভূমি দস্যুরা।
স্থবির উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
এই বিরোধের কারণে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী অনেক কৌশলগত এলাকায় জেটি নির্মাণ বা ইয়ার্ড সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। রেলওয়ের বগি ও ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান সংকুলান হচ্ছে না। দুই সংস্থার এই সমন্বয়হীনতায় প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেন সমাধান হচ্ছে না?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত ৬৫ বছরে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কয়েকবার যৌথ জরিপের নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি। মূলত দুই সংস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ‘ইগো’ বা প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই এই সংকটকে জিইয়ে রেখেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ের ভূমি বিরোধ কেবল দুটি সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যদি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়, তবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়বে।
 আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com