বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, সিলেট: দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) অন্যতম প্রধান উৎস সিলেট অঞ্চল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারা এই অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য (ইউকে), যুক্তরাষ্ট্র (ইউএসএ) এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে পাঠানো প্রবাসী আয় সিলেটের আবাসন (রিয়েল এস্টেট) ও বাণিজ্যিক খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেমিট্যান্স আয়ে বরাবরের মতোই দেশের শীর্ষ তিন বিভাগের মধ্যে অবস্থান ধরে রেখেছে সিলেট। মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশজুড়ে ২৬২ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে, যার একটি বড় অংশ যুক্ত হয়েছে সিলেটের অর্থনীতিতে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এই প্রবাহ আরও বেগবান হয়েছে।
সিলেটের শাহজালাল উপশহর, আম্বরখানা, কুমারগাঁও এবং বিমানবন্দর সড়ক সংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রবাসীদের বিনিয়োগে গড়ে উঠছে বহুতল বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীদের বিনিয়োগের ধরনে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে প্রবাসীরা কেবল খালি জায়গা বা প্লট কিনে রাখতেন, কিন্তু এখন তারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন রেডি অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
আবাসন ব্যবসায়ীরা জানান, প্রবাসীদের নতুন প্রজন্ম এখন সিলেটে এসে নিজেদের নিরাপত্তা ও আধুনিক নাগরিক সুবিধার দিকে বেশি নজর দেন। ফলে সুইমিং পুল, নিজস্ব জিমনেশিয়াম ও সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্টগুলোর চাহিদা এখন তুঙ্গে।
এই চাহিদাকে আরও গতিশীল করতে সম্প্রতি সিলেটে আয়োজিত ‘গ্লোবালাইজিং সিলেট’ সেমিনারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন যে, প্রবাসীদের বিনিয়োগ নিরাপদ করতে সরকার বিশেষ আবাসন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। জমি কমে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে প্লটের বদলে প্রবাসীদের জন্য অ্যাপার্টমেন্টভিত্তিক আধুনিক আবাসন প্রকল্প সিলেট থেকেই শুরু করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক খাতে বৈচিত্র্য ও নতুন উদ্যোগ
শুধুমাত্র চার দেয়ালের আবাসনেই সীমাবদ্ধ নেই প্রবাসীদের এই অর্থ। যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের হাত ধরে সিলেটের বাণিজ্যিক খাতেও বড় পরিবর্তন আসছে।
হোটেল ও পর্যটন শিল্প: ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে এবং শ্রীমঙ্গল-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় প্রবাসীদের অর্থায়নে বিশ্বমানের পাঁচ তারকা হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠছে।
হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার: আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে প্রবাসীদের যৌথ মালিকানায় সিলেটে একাধিক আধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সুপারশপ ও রেস্তোরাঁ: জিন্দাবাজার ও উপশহর এলাকায় আন্তর্জাতিক চেইনের আদলে গড়ে ওঠা সুপারশপ ও রেস্তোরাঁগুলোর সিংহভাগ বিনিয়োগই আসছে লন্ডন ও আমেরিকা প্রবাসীদের কাছ থেকে।
বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দাবি
রেমিট্যান্সের এই জোয়ারের মধ্যেও কিছু কাঠামোগত সমস্যা প্রবাসীদের পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ইউটিলিটি সংযোগ (গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি) ও লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা প্রবাসীদের অনেক সময় নিরুৎসাহিত করে।
এই জটিলতা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবাসীরা যাতে দেশে এসে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রদানের কাজও চলছে, যা তাদের বিনিয়োগকে শতভাগ সুরক্ষা দেবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়কের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়া এবং ওসমানী বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন পুরোপুরি শেষ হলে প্রবাসীদের এই বিনিয়োগ কেবল আবাসন বা বাণিজ্যিক ভবনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সিলেটের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উৎপাদন খাতেও ছড়িয়ে পড়বে।