Home ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্বীকৃতির গৌরবে বগুড়ার দই, কাঁচামালের আগুনে পুড়ছে মুনাফা

স্বীকৃতির গৌরবে বগুড়ার দই, কাঁচামালের আগুনে পুড়ছে মুনাফা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, বগুড়া: ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতি মেলার পর দেশ-বিদেশে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী দইয়ের ব্র্যান্ড ভ্যালু ও চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু এই বৈশ্বিক সুনামের সমান্তরালে স্থানীয় দই শিল্প এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুধ, চিনিসহ দুগ্ধজাত খাদ্যের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের উৎপাদকদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। মাঠ পর্যায়ের দই ব্যবসায়ীদের দাবি, ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে তারা এখন নামমাত্র লাভে, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনে ব্যবসা টিকিয়ে রাখছেন।
জিআই স্বীকৃতি ও বাণিজ্যিক প্রসারের নতুন দিগন্ত
২০২৩ সালে অফিশিয়ালি জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে ‘বগুড়ার দই’ একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই স্বীকৃতির পর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বগুড়ার দইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রপ্তানির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দই চলে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
শহরের নবাববাড়ি রোড, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক এবং চেলোপাড়ার শতবর্ষী দইয়ের শোরুমগুলোতে এখন প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে।
নামী ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও অনলাইনের মাধ্যমে দেশব্যাপী দই সরবরাহ করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার সরা দই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে।
কাঁচামালের বাজারে আগুন: বিপাকে উৎপাদকরা
বাণিজ্যিক এই রমরমা অবস্থার আড়ালে মাঠ পর্যায়ের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। দই তৈরির প্রধান উপাদান কাঁচা দুধ, চিনি এবং মাটির সরা বা পাত্রের দাম গত এক বছরে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এক বছর আগে যে তরল দুধ প্রতি লিটার ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় কেনা যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। একইভাবে চিনির চড়া দাম এবং লাকড়ি ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দই তৈরির প্রক্রিয়াকরণ খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর বাইরে দই জমানোর জন্য ব্যবহৃত মাটির সরা তৈরিতে মৃৎশিল্পীদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি সরার পেছনে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
গুণগত মান বনাম মূল্য সমন্বয়ের সংকট
কাঁচামালের দাম বাড়লেও বাজারে হুট করে দইয়ের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান স্থানীয় কারিগর ও শোরুম মালিকরা। বগুড়ার একটি ঐতিহ্যবাহী দই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জানান, “দইয়ের দাম অতিরিক্ত বাড়ালে সাধারণ ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আবার দাম না বাড়ালে লোকসান দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমরা মুনাফার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছি।”
কিছু কিছু ছোট ব্যবসায়ী টিকে থাকার লড়াইয়ে দইয়ের ওজন বা সরা ছোট করার পথ বেছে নিচ্ছেন, যা সামগ্রিকভাবে বগুড়ার দইয়ের দীর্ঘদিনের সুনামের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে বড় ও নামী ব্র্যান্ডগুলো তাদের ঐতিহ্য ও গুণগত মান (Quality) ধরে রাখতে গিয়ে লাভের গুড় পিঁপড়াকে খাওয়ানোর মতো অবস্থায় পড়েছেন।
রপ্তানি জটিলতা ও সরকারি সহায়তার দাবি
জিআই স্বীকৃতির পর বগুড়ার দই বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে বিদেশে রপ্তানির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা কোল্ড চেইন (Cold Chain) লজিস্টিকস এবং বিশেষায়িত প্যাকেজিং ব্যবস্থার অভাবে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
দই একটি পচনশীল পণ্য হওয়ায় দ্রুততম সময়ে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রেখে বিদেশে পাঠানোর জন্য যে ধরনের কারিগরি ও বিমান পরিবহন সুবিধা প্রয়োজন, তা এখনো অধরা।
বগুড়া জেলা ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং দই ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা মনে করেন, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবিলম্বে দুগ্ধ খামারিদের গো-খাদ্যে ভর্তুকি দিয়ে দুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সেই সাথে দই রপ্তানির প্রক্রিয়া সহজ করতে বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষায়িত কার্গো সুবিধা এবং দই শিল্পের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায়, বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেলেও কাঁচামালের বাজারের চাপে বগুড়ার এই গৌরবময় লোকশিল্পের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
আরও নানা বিষয় জানত ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com