পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২৪ মে ঘোষিত ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের ফল কেবল একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, বরং তা রাজ্য রাজনীতির গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের স্পষ্ট দলিল। ১ লাখ ৯ হাজারেরও বেশি ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজেপির দেবাংশু পাণ্ডার জয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) চতুর্থ স্থানে নেমে যাওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলকে একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—এটি কি সাময়িক কোনো ‘ফলতার ধাক্কা’, নাকি তৃণমূলের ভেতর দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং সাংগঠনিক ভাঙনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ?
১. ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর ওপর সরাসরি আঘাত
ফলতা আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এটি তৃণমূলের অঘোষিত ‘নম্বর টু’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত। বিগত নির্বাচনগুলোতে এই অঞ্চলে বিরোধীদের কার্যত কোনো অস্তিত্বই ছিল না, যাকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে নিশ্ছিদ্র সাংগঠনিক দক্ষতার ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ বলে প্রচার করা হতো।
কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে যখনই মানুষ ভয়হীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেল, তখনই এই তথাকথিত মডেল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভকে যে পেশীশক্তি দিয়ে চেপে রাখা হয়েছিল, ফলতার ইভিএম তারই সম্মিলিত প্রতিবাদের ফল।
২. পলায়নপর মনোভাব ও অন্তর্ঘাত
ভোটের মাত্র দুদিন আগে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের হঠাৎ করে ‘প্রতিদ্বন্দিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর’ ঘোষণা তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতাকে নগ্ন করে দিয়েছে। দলের ভেতরের একটি বড় অংশের মতে, জাহাঙ্গীর খান বুঝতে পেরেছিলেন যে বুথ দখল বা রিগিং করার কোনো সুযোগ এবার থাকবে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালানোর পথ বেছে নেন।
একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক দলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়া একজন প্রার্থীর এভাবে সরে দাঁড়ানো প্রমাণ করে যে, দলের নিচুতলার ওপর শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল হয়ে পড়েছে।
৩. বামপন্থীদের পুনরুত্থান এবং তৃণমূলের ভোট-ব্যাংক ধস
ফলতার ফলের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো সিপিআই(এম) প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মির দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা এবং ৪০,৬৪৫ ভোট পাওয়া। যেখানে তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ৭,৭৮৩ ভোট, যার ফলে ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হলো। এর সোজা অর্থ—তৃণমূলের সনাতন ভোটব্যাংক সম্পূর্ণ ধসে গেছে এবং সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক ভোটাররা বিকল্প হিসেবে হয় বামপন্থা, না হয় বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন।
৪. আদি বনাম নব্য কোন্দলের চূড়ান্ত রূপ
ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলের ভেতর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো অনুগামীরা সমস্ত ব্যর্থতার দায় চাপাতে শুরু করেছেন অভিষেকের ‘কর্পোরেট স্টাইল’ রাজনীতি এবং তার ঘনিষ্ঠ যুবনেতাদের ওপর। ফলতার এই শোচনীয় ফল সেই অভ্যন্তরীণ বিরোধে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। দলের জেলা স্তরের নেতারা এখন প্রকাশ্যে বলছেন যে, উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্বকে সাধারণ মানুষ আর গ্রহণ করছে না।
৫. শাসকের হাত থেকে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া
তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের মূল ভিত্তি ছিল স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের পরোক্ষ সহযোগিতা। ফলতায় নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থান এবং উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইপিএস অফিসার অজয় পাল শর্মার মতো পর্যবেক্ষকদের কঠোর ভূমিকা প্রমাণ করেছে যে, পুলিশি ছত্রছায়া সরে গেলে তৃণমূলের ভোট পাওয়ার সাংগঠনিক সক্ষমতা কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
ফলতার এই ঘটনাকে স্রেফ একটি নির্বাচনী ধাক্কা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের একক আধিপত্যের অবসান এবং দলের ভেতরের আদর্শগত ও সাংগঠনিক দেউলিয়াগ্রস্ততার এক চূড়ান্ত বিজ্ঞাপন। শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের মুখে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কীভাবে এই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।