আফ্রিকা মহাদেশটি মূলত দুটি বিশাল টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থিত— একটি হলো নুবিয়ান প্লেট (Nubian Plate) এবং অন্যটি সোমালি প্লেট (Somali Plate)।বর্তমানে এই প্লেট দুটি প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৭ মিলিমিটার গতিতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই টেকটোনিক বিচ্যুতির কারণেই পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ভূত্বক (Earth’s crust) পাতলা হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্যবর্তী ‘তুর্কানা রিফ্ট’ (Turkana Rift) অঞ্চলের ভূত্বক এতটাই পাতলা হয়ে গেছে যে, এটি মহাদেশটি ভেঙে যাওয়ার এক চূড়ান্ত বা ‘নেকিং’ (Necking) পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কেনিয়ার ফাটল ও সাম্প্রতিক প্রভাব
কেনিয়ার মাই মাহিউ (Mai Mahiu) অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাওয়া প্রধান মহাসড়কটিতে আকস্মিকভাবে একটি বিশাল ফাটল দেখা দেয়। ৫০ ফুটেরও বেশি গভীর এবং চওড়া এই ফাটলটি ফসলি জমি, ঘরবাড়ি এবং যাতায়াত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
তবে ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই ফাটলটি তৈরি হওয়ার পেছনে দুটি ভিন্ন মত রয়েছে:
১. ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক মুভমেন্ট: একটি বড় অংশের ধারণা, মাটির গভীরে টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত সরে যাওয়ার ফলেই এই দীর্ঘ ফাটল তৈরি হয়েছে।
২. ভারী বৃষ্টিপাত ও পাইপিং (Piping): কিছু বিজ্ঞানীর মতে, ওই অঞ্চলে হওয়া তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণে ভূগর্ভস্থ নরম আগ্নেয় ছাই এবং মাটি ধুয়ে যাওয়ার ফলে উপরিভাগের মাটি ধসে এই বিশাল গর্ত বা ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে।
ভবিষ্যৎ মানচিত্র: জন্ম নেবে নতুন মহাসাগর
এই ভাঙন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি আসতে আরও প্রায় ১ থেকে ৫ কোটি (১০ থেকে ৫০ মিলিয়ন) বছর সময় লাগবে। তবে যখন এই বিভাজনটি সম্পূর্ণ হবে, তখন পৃথিবীর মানচিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে।
সোমালি প্লেটের বিচ্ছিন্নতা: সোমালিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়া এবং তানজানিয়ার কিছু অংশ মূল আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি নতুন উপ-মহাদেশ বা দ্বীপে পরিণত হবে।
নতুন মহাসাগরের সৃষ্টি: প্লেট দুটি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর মাঝখানের নিচু উপত্যকায় ভারত মহাসাগরের পানি প্রবেশ করবে। ফলে লোহিত সাগরের মতো একটি সম্পূর্ণ নতুন মহাসাগরের জন্ম হবে।
স্থলবেষ্টিত দেশের সুবিধা: বর্তমানে আফ্রিকার রুয়ান্ডা বা উগান্ডার মতো যেসব দেশ সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত (Landlocked), মহাদেশটি বিভক্ত হলে তারা নতুন সমুদ্র উপকূলরেখা লাভ করবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে।
ভূগর্ভের এই বিশাল পরিবর্তন মানব সভ্যতার চোখের আড়ালে অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘটলেও, কেনিয়ার এই ফাটল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবী এখনো এক জীবন্ত এবং পরিবর্তনশীল গ্রহ।