শামসুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: ব্রিটিশ আমলের উত্তাল বঙ্গোপসাগর। দিগন্তজোড়া জলরাশি ভেদ করে এগিয়ে চলেছে বিশাল বিশাল কাঠের সাম্পান আর পালতোলা জাহাজ। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে নোঙর তুলে এই জাহাজগুলো পাড়ি জমাত সুদূর রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন), সিংহল (শ্রীলঙ্কা) কিংবা মালয় উপদ্বীপের বন্দরে।
সে সময় চট্টগ্রামের সওদাগরদের দাপট ছিল বিশ্বজুড়ে, আর তাঁদের ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল এই সাহসী সমুদ্রযাত্রা।
সাম্পান যখন বাণিজ্যের সারথি:
আজকের দিনে ‘সাম্পান’ বলতে আমরা ছোট নৌকো বুঝলেও, ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামের সওদাগরদের সাম্পান ছিল আধুনিক জাহাজের আদিরূপ। এসব সাম্পান ছিল বিশাল আকৃতির, যা শত শত টন পণ্য বহনে সক্ষম ছিল।
চাকতাই এবং খাতুনগঞ্জের সওদাগররা নিজস্ব কারিগর দিয়ে এসব মজবুত কাঠের জাহাজ তৈরি করাতেন। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা এবং সন্দ্বীপের দুর্ধর্ষ নাবিকরা (যাঁদের স্থানীয়ভাবে ‘সারেং’ বা ‘সুঁকানি’ বলা হতো) কম্পাস আর ধ্রুবতারা দেখে জাহাজ নিয়ে পৌঁছে যেতেন অচেনা সব বন্দরে।
বার্মা-সিংহল-মালয়: বাণিজ্যের স্বর্ণপথ:
ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রামের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। সওদাগরদের সেই গৌরবময় দিনগুলোর প্রধান কিছু রুট ছিল:
রেঙ্গুন (মিয়ানমার): চাল এবং সেগুন কাঠের বাণিজ্যের জন্য রেঙ্গুন ছিল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রধান গন্তব্য। চট্টগ্রাম থেকে শুঁটকি, নারিকেল ও সুতি কাপড় নিয়ে জাহাজ যেত রেঙ্গুনে, আর ফেরার পথে নিয়ে আসত উন্নত মানের বার্মা চাল ও কাঠ।
রেঙ্গুনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এতটাই ছিল যে, সেখানে বিশাল একটি ‘চিটাগং কলোনি’ গড়ে উঠেছিল।
সিংহল (শ্রীলঙ্কা): চায়ের দেশ শ্রীলঙ্কার সাথেও চট্টগ্রামের সওদাগরদের সখ্য ছিল দেখার মতো। চাল এবং ডাল নিয়ে চট্টলার সওদাগররা পাড়ি জমাতেন কলম্বো বন্দরে।
মালয় অঞ্চল (মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর): মশলা এবং রবারের টানে চট্টগ্রামের বড় বড় সাম্পান যেত পেনাং এবং সিঙ্গাপুর বন্দরে। এই দীর্ঘ যাত্রায় নাবিকরা মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটাতেন।
সওদাগরদের আভিজাত্য ও অর্থনীতি:
এই বাণিজ্যের হাত ধরেই চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে এক বিশাল ধনিক শ্রেণি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেও যার প্রভাব স্পষ্ট— “ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দেওয়ানা” কিংবা রেঙ্গুন প্রবাসীদের নিয়ে লেখা অসংখ্য গান ও পুঁথি সেই সমৃদ্ধিরই সাক্ষী দেয়।
সওদাগররা কেবল পণ্য বিনিময় করতেন না, তাঁরা চট্টগ্রামকে বিশ্ব মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র (Hub) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে চট্টগ্রামে নির্মিত হয়েছে অনেক রাজকীয় অট্টালিকা, যা আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“চট্টগ্রামের সওদাগররা কেবল ব্যবসায়ী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সমুদ্রজয়ী অভিযাত্রী। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সেই বিশাল সাম্পানগুলো হারিয়ে গেলেও কর্ণফুলীর ঢেউ আজও তাঁদের সেই সাহসিকতার গল্প বলে।”
ইতিহাসের পাতায় বর্তমান:
সময়ের বিবর্তনে পাল তোলা সাম্পানের জায়গা নিয়েছে বিশালকার কনটেইনার জাহাজ। বাণিজ্যের ধরন বদলেছে, কিন্তু চট্টগ্রামের মানুষের রক্তে সমুদ্র জয়ের নেশা আজও রয়ে গেছে। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ আমলের সেই ‘গোল্ডেন এরা’ বা সোনালি যুগ ছিল চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তিপ্রস্তর।