Home জাতীয় ড্রাগন ও টাইগারের মিতালী: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

ড্রাগন ও টাইগারের মিতালী: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি ‘বেঙ্গল টাইগার’ খ্যাত বাংলাদেশ এবং বৈশ্বিক পরাশক্তি ‘ড্রাগন’ চীনের মধ্যকার সম্পর্ক এখন এক অনন্য উচ্চতায়। গত পাঁচ দশকে এই দুই দেশের বন্ধুত্ব কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে এক গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্বে।
২০২৬ সালে এসে উন্নয়ন, বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন রূপরেখা তৈরি করছে।
১. অবকাঠামো ও উন্নয়ন: উন্নয়নের মহাসড়কে যৌথ যাত্রা
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতায় বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়ার পর এখন ডিজিটাল এবং সবুজ অবকাঠামোতে (Green Infrastructure) জোর দিচ্ছে চীন।
মেগা প্রজেক্ট: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং কর্ণফুলী টানেলের পর এখন উত্তরবঙ্গের শিল্পায়নে চীনের বড় বিনিয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নতুন উদ্যোগ: ২০২৬ সালের সরকারি তথ্যানুযায়ী, চীন বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে।
২. আমদানি-রপ্তানি: বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাসের চ্যালেঞ্জ
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এখনও একটি বড় চিন্তার বিষয়।
আমদানি: বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ২৫-৩০ শতাংশই আসে চীন থেকে, যার বড় অংশই হলো তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল এবং ভারী যন্ত্রপাতি।
রপ্তানি: ৯৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চামড়াজাত পণ্য, সি-ফুড এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের তথ্যমতে, গত এক বছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিনিময়: মেধাবীদের গন্তব্য
উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এখন পছন্দের শীর্ষে চীন।
স্কলারশিপ: প্রতি বছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী সরকারি ও বেসরকারি বৃত্তিতে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে পাড়ি জমাচ্ছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শিক্ষায় চীনকে মূল অংশীদার ভাবছে বাংলাদেশ।
কারিগরি শিক্ষা: বাংলাদেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আধুনিকায়নে চীন প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে।
৪. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা: নতুন ভরসা
চিকিৎসা খাতে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা এখন আর কেবল ওষুধ আমদানিতে সীমাবদ্ধ নেই।
মৈত্রী হাসপাতাল: ২০২৬ সালের শুরুতেই ঢাকায় ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘চীন-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ জেনারেল হাসপাতাল’ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস: দেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের (API) সিংহভাগই আসছে চীন থেকে। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে মেডিকেল সরঞ্জাম উৎপাদনের জন্য বেশ কিছু চীনা কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের পর চীনের সঙ্গে এই কৌশলগত সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে কিছু ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে ‘টাইগার’ ও ‘ড্রাগনের’ এই মিথস্ক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখছে।