বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথগুলোতে সোমালি জলদস্যুদের পুরোনো আতঙ্ক নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে। তবে দশ-বারো বছর আগে যেভাবে এলোমেলোভাবে জাহাজে চড়াও হয়ে ছিনতাই করা হতো, এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। বর্তমান জলদস্যু চক্রগুলো রীতিমতো সংগঠিত সিন্ডিকেটের মতো কাজ করছে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। ভারত মহাসাগর কিংবা এডেন উপসাগরে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ কবজায় নেওয়ার পর দরকষাকষি থেকে শুরু করে নিরাপদে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার প্রতিটি ধাপে তারা নিখুঁত পেশাদারিত্বের ছাপ রাখছে।
কোনো জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সাথে সাথেই দস্যুরা প্রথমেই তার সব ধরনের আধুনিক যোগাযোগ ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এরপর ধীরেসুস্থে জাহাজটিকে নিয়ে যাওয়া হয় সোমালিয়ার পান্টল্যান্ড বা গালমুদুগ উপকূলের এমন সব এলাকায়, যেখানে পৌঁছানো বাইরের কারো পক্ষে বেশ কঠিন। নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করার পর শুরু হয় আসল পরিকল্পনা। যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের ধার ধারে না; নজরদারি এড়াতে ব্যবহার করে উন্নত মানের স্যাটেলাইট ফোন এবং পুরোপুরি এনক্রিপ্ট করা নিরাপদ মেসেজিং ব্যবস্থা, যাতে সহজে তাদের অবস্থান কেউ শনাক্ত করতে না পারে।
টাকা দাবির কৌশলও বদলে গেছে পুরোপুরি। জাহাজ মালিক বা আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানির সাথে দস্যুরা নিজেরা সরাসরি কথা বলে সময় নষ্ট করে না। এর বদলে মাঠে নামানো হয় মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের। এই অদৃশ্য মধ্যস্থতাকারীরাই একদিকে মালিকপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখে, অন্যদিকে দস্যুদের নির্দেশনা পৌঁছে দেয়। শুধু তা-ই নয়, জাহাজে থাকা পণ্যের ধরন, বিশ্ববাজারে পণ্যের বর্তমান দাম এবং জিম্মি নাবিকরা কোন দেশের নাগরিক—সব সমীকরণ মাথায় রেখে তবেই মুক্তিপণের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়। অর্থ আদায়ে দ্রুত ফল পেতে তারা নাবিকদের পরিবারের ওপর আবেগীয় ও মানসিক চাপ সৃষ্টির ফাঁদও তৈরি করে।
লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াতে দস্যুরা এখনো পুরোনো ও নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে নগদ ডলারকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। কোনো নির্জন জলসীমায় দিনক্ষণ ঠিক করে ছোট বিমান বা হেলিকপ্টার থেকে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ভরে জাহাজের ডেকে ডলারের বান্ডিল ফেলা হয়। টাকা পাওয়ার পর কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিতে জাহাজে বসেই বিশেষ মেশিন দিয়ে প্রতিটি নোট পরীক্ষা করে দেখা হয় এবং গণনা নিশ্চিত করা হয়।
টাকা বুঝে পাওয়ার পর কোনো প্রকার হুলস্থূল বা বিশৃঙ্খলা না করে দস্যুরা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় জাহাজ ছেড়ে চলে যায়। আগেই তৈরি রাখা একাধিক দ্রুতগতির স্পিডবোটে করে তারা আলাদা আলাদা দলে ভাগ হয়ে উপকূলে পৌঁছায়। সোমালিয়ার ভেতরের অঞ্চলে পৌঁছানোর পর তাদের আর কোনো ভয় থাকে না, কারণ স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও গোত্রপ্রধানদের সাথে তাদের বোঝাপড়া আগে থেকেই পাকা করা থাকে।
ভারত মহাসাগরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপারেশন আটলান্টার যুদ্ধজাহাজ কিংবা আন্তর্জাতিক যৌথ টাস্কফোর্স নিয়মিত পাহারা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সোমালিয়ার বিশাল উপকূলরেখা আর সেদেশের ভঙ্গুর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সুযোগ নিচ্ছে এই অপরাধীরা। তাছাড়া ইদানীং লোহিত সাগর ও আশপাশের অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক নজর কিছুটা অন্যদিকে সরে গেছে। ঠিক সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই সমুদ্রের এই দস্যুরা নিজেদের তৎপরতাকে আরও আধুনিক ও পেশাদার অপরাধ ব্যবসায় রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক শিপিং খাতের সর্বশেষ অনুসন্ধানী খবরের জন্য businesstoday24.com ফলো করুন