Home First Lead ২২ দেশের ১১৩ বন্দরে একযোগে ধর্মঘট, চাপে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা

২২ দেশের ১১৩ বন্দরে একযোগে ধর্মঘট, চাপে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা

শিপিং ডেস্ক
বাণিজ্যিক বন্দরকে যুদ্ধের রসদ সরবরাহে ব্যবহার না করার জোরালো দাবি নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য। সংঘাতপূর্ণ নৌপথে নাবিকদের জীবনের সুরক্ষা, বেতন বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে গত ৩০ অক্টোবর একযোগে বিশ্বের ২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেছেন বন্দর শ্রমিক ও সমুদ্রকর্মীরা।
‘আমরা যুদ্ধের জন্য কাজ করব না’ স্লোগানকে সামনে রেখে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বন্দরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই কর্মসূচিতে স্থবির হয়ে পড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, স্পেনের বাস্ক অঞ্চল, তুরস্ক ও মরক্কোর শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পরবর্তীতে সংহতি জানায় পঁচিশটিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংগঠন। ধর্মঘটের বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে গ্রিসের ওপর। দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র পিরেয়াস বন্দরে প্রায় তিন হাজার কর্মী কাজে যোগ না দেওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ থাকে কনটেইনার খালাস। ব্যাহত হয় স্থানীয় দ্বীপগুলোতে চলাচুলকারী ফেরি সেবাও, যার ফলে দুর্ভোগে পড়েন বহু সাধারণ যাত্রী ও পর্যটক।
একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা গেছে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া ও আলজেসিরাস, ফ্রান্সের লে আভর, ইতালির জেনোয়া, মরক্কোর তাঞ্জিয়ার মেড এমনকি ভারতের নাভা শেভা বন্দরেও।
শ্রমিকদের প্রধান বক্তব্য স্পষ্ট, সাধারণ পণ্য আনা-নেওয়ার বন্দরকে যেন অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সেনাসদস্য পরিবহনের সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা না হয়। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় রসদ সরবরাহের কারণে গভীর সমুদ্রে সাধারণ নাবিকদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গ্রিসের নাবিক সংগঠন পেনেনের দাবি অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরের প্রথম তিন সপ্তাহেই পারস্য উপসাগরে জাহাজে অন্তত ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরেও শত শত হামলার মুখে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বহু নাবিক। তাই ১২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি ও সাত ঘণ্টার কর্মদিবসের পাশাপাশি প্রতিটি জাহাজে জরুরি চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রাখার জোরালো দাবি তুলেছেন তাঁরা। ভারতীয় শ্রমিক প্রতিনিধিরাও নৌপথের এই নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এই ধর্মঘটের কারণে বিপুল অঙ্কের পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন সাময়িক থমকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হলেও বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরির সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বহু বন্দরে কর্মসূচি ছিল কেবল কয়েক ঘণ্টার, আবার জার্মানিতে সমঝোতার কারণে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট এড়ানো গেছে। তবে সময়মতো কনটেইনার খালাস না হওয়া কিংবা জাহাজের সূচি বদলে যাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে পচনশীল ও জরুরি শিল্পপণ্যে।
ইউরোপের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ও কাঁচামাল আমদানির সময়সূচিতেও প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
অর্থনৈতিক স্বার্থ আর মানবিক সুরক্ষার এই টানাপোড়েন এখন বিশ্বজুড়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যুদ্ধের অংশীদার না হওয়ার যে বার্তা বন্দরকর্মীরা দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন এক বাস্তবতাকে দাঁড় করিয়েছে।