পরবর্তী বৈশ্বিক মহামারির মোকাবিলা করার জন্য বর্তমান বিশ্ব মোটেও “ভালোভাবে প্রস্তুত” নয় বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাবেক প্রধান টম ফ্রিডেন। বর্তমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের ধীর প্রতিক্রিয়া এবং মার্কিন জনস্বাস্থ্য খাতে বাজেট হ্রাসের বিষয়টিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘রিসলভ টু সেভ লাইভস’-এর বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টম ফ্রিডেন ‘ব্লুমবার্গ দিস উইকেন্ড’ অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন।
টম ফ্রিডেন বলেন, “চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কারণে কোনো বিশ্বব্যাপী মহামারি তৈরি হবে না এবং এটি বিপুল সংখ্যক আমেরিকানদের জন্য বড় কোনো ঝুঁকিও সৃষ্টি করবে না। তবে এটিকে একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে ধরা যায়, যেখানে পুরো বিশ্ব খুব একটা ভালো করতে পারছে না। আমি বলব, এখন পর্যন্ত আমরা এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছি, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক এক অমঙ্গল সংকেত।”
আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ আপডেট নিচে তুলে ধরা হলো:
ডিআর কঙ্গোতে বর্তমানে ইবোলা আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০১ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং সন্দেহভাজন মৃতের সংখ্যা ২২০ ছাড়িয়েছে। কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশ এই মহামারীর উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে এ পর্যন্ত সাতজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
নতুন ও বিপজ্জনক স্ট্রেন
এবারের প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার একটি বিরল ধরণ ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibuguyo) স্ট্রেন দ্বারা ছড়াচ্ছে। এটি মূলত ফলখেকো বাদুড় বহন করে এবং আক্রান্ত পশুপাখি বা রোগীর শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এই স্ট্রেনটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মারা যান।
বৈশ্বিক সতর্কতা ও জরুরি অবস্থা
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে এটিকে এখনও বৈশ্বিক মহামারী বা ‘প্যান্ডেমিক’ স্তরের জরুরি অবস্থা বলা হয়নি। কঙ্গোতে এই প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ থেকে বাড়িয়ে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ স্তরে উন্নীত করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও ভ্যাকসিনের সীমাবদ্ধতা
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, ইবোলার এই নির্দিষ্ট বুন্দিবুগিও ধরনের জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। তবে ব্রিটিশ চিকিৎসকেরা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছেন, যা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মানবদেহে পরীক্ষার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ
কানাডা: ইবোলা-আক্রান্ত অঞ্চল (কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডা) থেকে আসা যাত্রীদের জন্য ২১ দিনের বাধ্যতামূলক সেলফ-আইসোলেশন চালু করেছে এবং এসব দেশের নাগরিকদের ইমিগ্রেশন আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
ইতালি: ইউরোপের সীমান্ত নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে এবং কঙ্গোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বিশেষ দল পাঠাচ্ছে।
ভারত: কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান এবং উগান্ডায় ভারতীয় নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের স্ক্রিনিং ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।