মোস্তফা তারেক, নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি আকস্মিক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন প্রত্যাশীরা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের জন্য সব ধরনের ইমিগ্র্যান্ট (অভিবাসী) ভিসা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
আগামী সপ্তাহ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক বছর ধরে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার বাংলাদেশি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
দীর্ঘদিন ধরে যারা স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা বাবা-মাকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছিলেন, তারা এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি স্পন্সরড’ ভিসার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা, যাদের ইন্টারভিউ বা ভিসার চূড়ান্ত পর্যায় ঘনিয়ে এসেছিল, তাদের স্বপ্ন এখন থমকে গেছে।
ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিপূর্বে করোনা মহামারির সময় সাময়িকভাবে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, একসঙ্গে ৭৫টি দেশের জন্য এমন গণ-স্থগিতাদেশের নজির ইতিহাসে বিরল। এর আগে বাংলাদেশকে ‘ভিসা বন্ড’-এর তালিকায় রাখায় উদ্বেগ ছড়িয়েছিল, আর এবার ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্তে সেই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হলো।
কী হবে অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের?
ইন্টারভিউ সূচি স্থগিত: যাদের আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইন্টারভিউ হওয়ার কথা ছিল, তাদের প্রক্রিয়াটি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যাবে।
ভিসা ক্যাটাগরির জটিলতা: স্বামী-স্ত্রী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের (Immediate Relatives) ক্ষেত্রে যে দ্রুততা ছিল, এই স্থগিতাদেশের ফলে তারাও সাধারণ ক্যাটাগরির মতো দীর্ঘ জটের মুখে পড়তে পারেন।
আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি: আবেদন বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় করার পর এখন আবার কবে নাগাদ দূতাবাস স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
নিউইয়র্ক ভিত্তিক ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক পরিবর্তনের এই ধাক্কা সামলানো কঠিন। বর্তমানে ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং আইনি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। তবে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, সেদিকেও তাকিয়ে আছেন অনেকে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, বৈধ পথে অভিবাসনের সুযোগ এভাবে বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের জনশক্তি ও সামাজিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রবাসীদের আর্তনাদ: “পরিবারকে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন কি শেষ?”
এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মাঝে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কথা:
১. কামরুল হাসান (নিউ ইয়র্ক প্রবাসী): দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য লড়ছেন কামরুল। তিনি বলেন, “সব কাগজপত্র ঠিক ছিল, আগামী মাসেই ইন্টারভিউ হওয়ার কথা ছিল। গত রাতেই মা ফোনে জিজ্ঞেস করছিলেন কী কী সাথে আনবেন। এখন তাদের কী জবাব দেব? এই বয়সে তারা আর কতদিন অপেক্ষা করবেন? অনির্দিষ্টকালের এই স্থগিতাদেশ আমাদের জীবনটাকেই অনিশ্চিত করে দিল।”
২. শায়লা পারভীন (ভার্জিনিয়া প্রবাসী): দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন, কিন্তু ভিসা জটিলতায় স্বামী এখনো বাংলাদেশেই আছেন। শায়লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এখানে বৈধভাবে ট্যাক্স দিচ্ছি, নাগরিক হিসেবে সব নিয়ম মানছি। কিন্তু নিজেদের পরিবারকে কাছে পাওয়ার অধিকার কেন এভাবে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? করোনা মহামারির সময় তাও একটা কারণ ছিল, কিন্তু এখন এভাবে ৭৫টি দেশকে ব্লক করা মানে আমাদের স্বপ্ন নিয়ে খেলা করা।”
৩. আরিফুর রহমান (টেক্সাস প্রবাসী): আরিফুর তার ছোট ভাইয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন প্রায় ১০ বছর আগে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভিসা পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে এমন সংবাদে তিনি স্তব্ধ। তিনি বলেন, “ভিসা বন্ডের পর এখন ইমিগ্রেশন বন্ধ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যারা বৈধ পথে আসতে চায়, তাদের জন্য এই পথ বন্ধ করে দিলে অবৈধ অভিবাসন আরও বাড়তে পারে।”