Home আন্তর্জাতিক নিউ ইয়র্ক প্রবাসীদের আর্তনাদ: ট্রাম্পের এক আদেশে তছনছ সাজানো পরিকল্পনা

নিউ ইয়র্ক প্রবাসীদের আর্তনাদ: ট্রাম্পের এক আদেশে তছনছ সাজানো পরিকল্পনা

মোস্তফা তারেক, নিউইয়র্ক: ১৪ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির এক কঠোরতম অধ্যায়। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের অভিবাসী ভিসা (ইমিগ্র্যান্ট ভিসা) অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তে স্থবির হয়ে পড়ছে গ্রিন কার্ড, ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ও এমপ্লয়মেন্ট-ভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়া। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েক লাখ বাংলাদেশি।
‘পাবলিক চার্জ’ ও স্বনির্ভরতার কঠোর শর্ত
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, তালিকাভুক্ত দেশগুলো থেকে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাওয়া (ওভারস্টে), নথিপত্র জালিয়াতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সাহায্য (ওয়েলফেয়ার, মেডিকেড, ফুড স্ট্যাম্পস) নেওয়ার প্রবণতা অত্যাধিক। ১৮৮২ সালের ‘পাবলিক চার্জ’ আইনকে আরও বিস্তৃত করে ট্রাম্প প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে—যারা মার্কিন করদাতাদের ওপর বোঝা হতে পারে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই নেই।
বিশ্লেষকরা একে দেখছেন একটি ‘স্মার্ট ফিল্টার’ হিসেবে, যার মাধ্যমে দক্ষ পেশাজীবী ছাড়া নিম্ন-দক্ষতার শ্রমিকদের প্রবেশাধিকার কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে প্রবাসীদের আর্তনাদ ও প্রতিক্রিয়া
এই সিদ্ধান্তের ফলে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও মিশিগানের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। সরজমিনে কথা বলে জানা গেছে সাধারণ প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
পারিবারিক বিচ্ছেদ: ব্রুকলিনে বসবাসরত ট্যাক্সি চালক রহিম উদ্দিন দীর্ঘ আট বছর ধরে অপেক্ষা করছেন তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে স্থায়ীভাবে আনার জন্য। তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সব পেপার রেডি ছিল, ইন্টারভিউয়ের তারিখ পাওয়ার কথা ছিল। এখন শুনছি সব বন্ধ। আমার সাজানো সংসারটা কি আর কোনোদিন এক হবে না?”
স্বপ্নভঙ্গ ও অনিশ্চয়তা: কুইন্সের একটি গ্রোসারি স্টোরে কর্মরত শিক্ষার্থী সিয়াম আহমেদ জানান, “আমার বাবা-মা দেশ থেকে আসার জন্য সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এখন তারা না পারবেন এখানে আসতে, না পারবেন দেশে আগের মতো জীবন কাটাতে। আমরা একটা বিশাল ট্র্যাপে পড়ে গেলাম।”
দায়িত্বহীনতার মাশুল: অনেক প্রবাসী অবশ্য মনে করছেন, কমিউনিটির কিছু মানুষের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের ফল ভোগ করতে হচ্ছে সবাইকে। জ্যামাইকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন, “অনেকে কাজ করার সক্ষমতা থাকলেও মিথ্যে তথ্য দিয়ে সরকারি ফুড স্ট্যাম্প বা মেডিকেল সুবিধা নেন। এই জালিয়াতিই আজ পুরো বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
আইনি ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইমিগ্র্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারপারসন অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী এই সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি স্ব-সৃষ্ট ফল। আমাদের কমিউনিটির কিছু লোকের দায়িত্বহীনতা এবং জনকল্যাণমূলক তহবিলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে আজ কয়েক লাখ মানুষের স্বপ্ন ঝুঁকির মুখে। এটি শুধু আর্থিক নয়, একটি গভীর মানসিক ও পারিবারিক বিপর্যয়।”
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ২৪০ জন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছিলেন। বর্তমানে কয়েক লাখ আবেদন প্রক্রাধীন রয়েছে। এই স্থগিতাদেশ কার্যকর হলে:
রেমিট্যান্স হ্রাস: দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সামাজিক সংকট: যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রবাসীদের একাকিত্ব এবং দেশে থাকা পরিবারের অনিশ্চয়তা বাড়বে।
অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি: আইনি পথ বন্ধ হওয়ায় অনেকে বিপদজনক পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন।
তবে আশার কথা হলো, স্টুডেন্ট (F-1), ট্যুরিস্ট (B-1/B-2) বা বিজনেস ভিসার মতো নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এই আদেশের আওতামুক্ত রয়েছে। ফলে ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ বা জরুরি ভ্রমণে কোনো বাধা থাকছে না।