- রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার: ৩১ দফার আলোকে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
- সামাজিক নিরাপত্তা: নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ধর্মীয় নেতাদের (ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিত) জন্য মাসিক সম্মানীর প্রতিশ্রুতি।
- কৃষি ও অর্থনীতি: কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, বিমা ও সেচ সুবিধা প্রদান এবং নদী খননের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা।
- শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য।
- পরিবেশ ও উন্নয়ন: পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদী খনন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশগত সুরক্ষা।
আমিরুল মোমেনিন, ঢাকা:
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলটির ঘোষিত ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ এবং সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের দেয়া জনমুখী প্রস্তাবনাগুলোকে ভিত্তি করেই সাজানো হচ্ছে এই বিশদ কর্মপরিকল্পনা।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের ইশতেহারে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েমের ব্লু-প্রিন্ট থাকছে এই দলিলে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিএনপি এবার অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে নগদ অর্থ সহায়তা অথবা চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে।
কৃষিখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা কেবল সার বা বীজে ভর্তুকি নয়, বরং কৃষি বিমা এবং সরাসরি মোবাইলে ফসলের চিকিৎসা ও বাজারের তথ্য পৌঁছে দেওয়ার গ্যারান্টি দেবে। এছাড়া মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিদেরও এই আধুনিক সুবিধার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল সনদমুখী না রেখে কর্মমুখী করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী আরবি, জাপানিজ বা ম্যান্ডারিনের মতো তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগটি তরুণ প্রজন্মের বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষার পরিবেশ আনন্দময় করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার বড় একটি অংশই পূরণ করা হবে নারী জনশক্তি দিয়ে। এটি একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেবে, অন্যদিকে নারী ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ এবং ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টিও এবারের ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নদী ও খাল খননের মাধ্যমে জলপথ সচল করা এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচিটি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি বড় পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি তাদের এই ইশতেহারের মাধ্যমে তরুণ ভোটার এবং সাধারণ মেহনতি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার চেষ্টা করছে। ২০শে জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত হতে যাওয়া এই ইশতেহারটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে।









