১৯৮৫ সালের মে মাস। ২৪ তারিখে উড়িরচরে সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আর ১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে তখন কেবল হাহাকার। সংবাদকর্মী হিসেবে সেই ধ্বংসযজ্ঞের খবর সংগ্রহ করতে আমি চট্টগ্রাম থেকে কুমিরা হয়ে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া পৌঁছি। সে সময়ে এ পথে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া মানেই ছিল জীবন-মৃত্যু হাতে নিয়ে এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া।
সন্দ্বীপে তখন ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয়ে ছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাসির উদ্দিন সাহেব। সেই প্রতিকূল সময়ে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল উপজেলা প্রশাসনের একটি এনালগ টেলিফোন লাইন। নাসির সাহেবের সহায়তায় সেখান থেকেই ঢাকায় সংবাদ পাঠাতাম। তিনিই আমাকে প্রথম জানিয়েছিলেন যে, ২ জুন সকালে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ সন্দ্বীপ থেকে উড়িরচরে যাবে। সেই সুযোগটিই গ্রহণ করি আমি। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান রফিক উল্লাহ চৌধুরীও গিয়েছিলেন একইসঙ্গে।
২ জুন উড়িরচরে যা দেখেছিলাম, তা কেবল সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও আমাকে স্তম্ভিত করেছিল। দিল্লির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ফেলে ‘এক কাপড়ে’ উড়িরচরে ছুটে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জে আর জয়বর্ধনে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের সঙ্গে তাঁরা যখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন প্রটোকলের কোনো লেশমাত্র ছিল না। তাঁরা খোলা মাঠে বসে দুর্গত মানুষের সাথে কথা বলেন এবং ত্রাণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি ছিল জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত একটি সরু ও নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হওয়া।
জয়বর্ধনে সামনে উঠলেন, পেছনে রাজীব গান্ধী পাজামা গুটিয়ে এবং এরশাদ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো পরবর্তীতে একে ‘ব্যাম্বু ডিপ্লোম্যাসি’ বা ‘বাঁশ কূটনীতি’ নামে অভিহিত করেছিল। ৩ জুন ১৯৮৫-র আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর (AP, Reuters, AFP) আর্কাইভে সেই সাঁকো পার হওয়ার ছবিটি ‘আঞ্চলিক সংহতির’ প্রতীক হিসেবে ঠাঁই পায়।
সেই দৃশ্যটি ৩ জুন সংবাদপত্রের পাতায় বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। কিন্তু দূর থেকে দেখা সেই সাংবাদিক হিসেবে আমার মনে হয়েছিল—রাজনীতি বা কূটনীতি নয়, সেদিন মানবতাই জয়ী হয়েছিল। প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে সেই ভাঙা সাঁকো পার হওয়ার ঝুঁকি নেওয়াটা ছিল দুর্গত মানুষের প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
এটি ছিল মূলত ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য প্রথম সার্ক (SAARC) সম্মেলনের ঠিক আগের একটি অভাবনীয় ভ্রাতৃত্বের প্রতিফলন। উল্লেখ্য, এর কয়েকদিন পর ৫ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকও এককভাবে উড়িরচর সফরে এসেছিলেন।
দিনভর সংবাদ সংগ্রহ শেষে ২ জুন সন্ধ্যায় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম ফিরে আসি। আমার সাথে ছিলেন তৎকালীন পিআইডির তথ্য কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার বিশ্বাস। তাঁর লালখান বাজার সরকারি কোয়ার্টারের বাসা থেকে তড়িঘড়ি করে ঢাকায় ডেসপাচ পাঠিয়ে যখন নিজের বাসায় ফিরলাম, তখন রাত অনেক।
সে সময় মোবাইল ফোন ছিল না, ফলে রনজিৎ বাবুর বাসা থেকে ফেরার পর পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় একটি বড় খবর আমার অগোচরে রয়ে গিয়েছিল। বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাজীব গান্ধী ও জয়বর্ধনে এবং রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ সেদিন ঢাকা ফিরতে না পেরে হেলিকপ্টারে এসে চট্টগ্রামে আটকে পড়েন। তড়িঘড়ি করে তাঁদের চট্টগ্রামের তৎকালীন একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ স্থান হোটেল আগ্রাবাদে (Hotel Agrabad) নিয়ে যাওয়া হয়। নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হোটেল আগ্রাবাদের একটি পুরো ফ্লোর খালি করে তাঁদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরদিন সকালে আবহাওয়ার উন্নতি হলে তাঁরা চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন।
আজ চার দশক পর পেছনে ফিরে তাকাই, তখন সন্দ্বীপের সেই উত্তাল সমুদ্র, উড়িরচরের সেই কাদা-মাটি আর বিশ্বনেতাদের সেই মানবিক আন্তরিকতার দৃশ্যগুলো অমলিন হয়ে ভাসে। ‘দৈনিক সংবাদ’-এর সেই দিনগুলো আর বর্তমানের হাই-টেক সাংবাদিকতার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও, খবরের পেছনের সেই আবেগ আর ঝুঁকি নেওয়ার তাড়না আজও একই রয়ে গেছে।