এমআরটি বনাম আধুনিক বাস সার্ভিস: খসড়া পরিকল্পনায় মেগা প্রজেক্টের বাস্তবতা
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: মহানগরীর যানজট নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে মেট্রোরেল (MRT) বা মনোরেলের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা চলছে। গণপরিবহনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে এই ধরনের দ্রুতগামী গণপরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা হলেও, ‘চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ খসড়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন ও বাস্তবসম্মত এক চিত্র।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, আগামী বেশ কয়েক দশকের জন্য চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের চেয়ে আধুনিক ও সুসংগঠিত বাস সার্ভিসই বেশি সাশ্রয়ী, কার্যকর ও যুক্তিসঙ্গত সমাধান।
একটি মেট্রোরেল বা এমআরটি ব্যবস্থা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে লাভজনক হতে হলে নির্দিষ্ট করিডোরে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রী চলাচলের চাহিদা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানের ট্রাফিক মডেলিং ও ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ও ট্রিপ সংখ্যা বাড়লেও অধিকাংশ রুটে মেট্রোরেল চালানোর মতো পর্যাপ্ত যাত্রী ঘনত্বের তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমনকি চরম অনুকূল পরিস্থিতিতেও ২০৪০ থেকে ২০৫০ সালের আগে এই যাত্রী সংখ্যা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে খসড়া প্রাক্কলনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি খরচের বিষয়টিও এখানে বড় একটি বিবেচ্য বিষয়। যেখানে চট্টগ্রামে একটি মনোরেল বা মেট্রোরেল নির্মাণে আনুমানিক ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে, সেখানে মাত্র দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা খরচে পুরো শহরের জন্য একটি বিশ্বমানের, আধুনিক এবং ডিজিটাল বাস নেটওয়ার্ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। এছাড়াও নাগরিক জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ যাত্রীরা বর্তমান বাসের ভাড়ার চেয়ে খুব বেশি বাড়তি ভাড়া দিয়ে মেট্রোরেলে যাতায়াতে খুব একটা আগ্রহী নন। ফলে বিপুল বিনিয়োগের পর পরিচালন ব্যয় তোলাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
খসড়া প্রতিবেদনে শহরের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। চট্টগ্রামের মূল প্রধান সড়কগুলোর উপর ইতোমধ্যে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়ে গেছে। এর ফলে একই রুটে নতুন করে এলিভেটেড বা উঁচুতে মেট্রোরেল লাইন বসানো কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল। অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
এই সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনে খসড়া মাস্টারপ্ল্যানে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বিশাল অঙ্কের ঋণে মেগা প্রজেক্টে অর্থ না ঢেলে বরং বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা আধুনিকায়ন করা। সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ডেডিকেটেড বাস লেন, বাস বে এবং পার্কিং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সাধারণ বাস সেবার মাধ্যমেই বন্দরনগরীর যাতায়াত চাহিদার সিংহভাগ সুশৃঙ্খলভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব।