বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঠাকুরাঁও: ২০০৯ সালের এক শরতে ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর গ্রামে যখন স্বপ্নীল, স্বর্ণালী আর সেঁজুতি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, তখন হয়তো অনেকেই একে কেবল এক অলৌকিক সমাপতন হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু আজ, দেড় দশক পর, সেই সমাপতন পরিণত হয়েছে এক অদম্য শক্তিতে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষায় এই তিন বোন কেবল পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং একে অপরের সবচেয়ে বড় সাহস হিসেবে কেন্দ্রের বেঞ্চে বসতে যাচ্ছে।
আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়—পথটা তাদের জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু ছিল একসূত্রে গাঁথা। বিজ্ঞান বিভাগের জটিল সমীকরণ মেলাতে মেলাতে তারা বেড়ে উঠেছে একে অপরের ছায়া হয়ে। স্কুলের করিডোরে একই ইউনিফর্মে এই তিন বোনকে দেখে খোদ শিক্ষকরাও যখন বিভ্রান্ত হন, তখন আড়ালে হয়তো তারা মুচকি হাসে। শিক্ষক মাহবুবুর রহমানের ভাষায়, “ওদের চেহারার মিল যতটা বিস্ময়কর, মেধার মিল ততটাই উজ্জ্বল।”
ভিন্ন স্বপ্ন, অভিন্ন গন্তব্য
একই আঙিনায় বড় হলেও তাদের ভাবনার জগৎটা বৈচিত্র্যময়। স্বপ্নীল বর্মণ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হয়েও হৃদয়ে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যকে; তার লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনিক সেবায় নিজেকে সঁপে দেওয়া। স্বর্ণালী বর্মণ স্বপ্ন দেখে সাদা অ্যাপ্রোনের পবিত্রতায় নিজেকে জড়িয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর অর্থাৎ চিকিৎসক হওয়ার। আর সেঁজুতি বর্মণ চায় মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষাকতাকে পেশা হিসেবে নিতে।
পড়াশোনার বাইরে এক সুরের মেলা
এই তিন বোন কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বেতারের ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী হিসেবে তারা সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে রাখে চারপাশ। সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসের কাল্পনিক দুনিয়া আর দেশাত্মবোধক গানের সুর—সবখানেই তারা সমান সাবলীল। এমনকি খাবারের পছন্দের ক্ষেত্রেও তাদের মিল চোখে পড়ার মতো; তিনজনেরই প্রথম পছন্দ বিরিয়ানি।
বাবা-মায়ের গর্বের ধন
ঠান্ডারাম বর্মণ ও ময়না রানী সেন দম্পতির কাছে এই তিন কন্যা কেবল সন্তান নয়, বরং তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়। মা ময়না রানী সেনের কাছে তাদের ঝগড়া আর খুনসুটিগুলোই জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি। আর বাবা ঠান্ডারাম বর্মণ আজ গর্বিত চিত্তে ঘোষণা করেন, সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তিনি এই তিন স্বপ্নের পালে হাওয়া দিতে প্রস্তুত।
পরীক্ষার এই চূড়ান্ত লগ্নে সালন্দর গ্রামের সেই পরিচিত পড়ার টেবিলে এখন তিনটি মাথা নিচু হয়ে আছে আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। তাদের এই যাত্রা কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জনের নয়, বরং তিন বোনের একসঙ্গে জয়ী হওয়ার এক অনন্য লড়াই।