Home বিশেষ প্রতিবেদন কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলার সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে সিমেন্ট শিল্প

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলার সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে সিমেন্ট শিল্প

অপরিনামদর্শী নীতিতে বন্ধ বহু কারখানা

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা : দেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ সিমেন্ট শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। গত কয়েক বছরে মেগা প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা এবং গ্রামাঞ্চলে পাকা বাড়ি নির্মাণের প্রবণতা বাড়ায় এই খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যা সামগ্রিক শিল্পের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাজারের আকার ও উৎপাদন ক্ষমতা
বর্তমানে বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫টির মতো সচল সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টন হলেও কারখানাগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৮ কোটি মেট্রিক টনেরও বেশি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ।
অপরিনামদর্শী নীতি ও নির্বিচারে অনুমতির মাশুল
সিমেন্ট খাতের এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ নীতিগত ভুল ও দূরদর্শিতার অভাব। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপরিনামদর্শিতার কারণে বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা কিংবা রপ্তানির বাস্তব সম্ভাবনা বিবেচনা না করেই একের পর এক নতুন সিমেন্ট কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
একটি ভারী শিল্পের লাইসেন্স দেওয়ার আগে যেখানে বাজার যাচাই ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক, সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা ও ক্ষণস্থায়ী চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে বাজারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি কারখানা তৈরি হয়েছে, যা তীব্র ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা না থাকা এবং বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে রপ্তানির আশানুরূপ পথ তৈরি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বহু কারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে না পেরে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগের পর এভাবে কারখানা বন্ধ হওয়া দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
এ বিষয়ে সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবুল মনছুর ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “যেকোনো দেশের শিল্পায়নে একটি মহাপরিকল্পনা থাকা জরুরি। আমাদের এখানে সিমেন্ট উৎপাদন কারখানার অনুমতি দেওয়ার আগে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা করেনি। নির্বিচারে ও অপরিকল্পিতভাবে কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার এই অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হচ্ছে এখন পুরো খাতকে। প্রতিযোগিতা সহ্য করতে না পেরে ইতিমধ্যেই বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা কর্মসংস্থান ও ব্যাংক ঋণ—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখনও যদি সরকার এই খাতের সুরক্ষায় পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ না করে, তবে সামনে আরও বড় সংকট তৈরি হবে।”
সংকটের অন্যান্য মূল কারণসমূহ
শিল্পটির প্রধান কাঁচামাল—ক্লিংকার, লাইমস্টোন, স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ এবং জিপসামের প্রায় সবটুকুই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় আগের চেয়ে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% বেড়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। অনেক কারখানা এলসি (ঋণপত্র) খুলতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা কাঁচামালের নিয়মিত সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রভাব
সিমেন্টের উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে বাজারে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম গত এক-দেড় বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। নির্মাণকাজের এই অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক বেসরকারি আবাসন প্রকল্প ধীরগতির হয়ে পড়েছে। সাধারণ ক্রেতারাও বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিমেন্টের বিক্রির ওপর।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) প্রেসিডেন্ট, চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক সিমেন্ট শিল্পে বিরাজমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন,  বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদান ক্লিংকারসহ অন্যান্য কাঁচামাল আমাদের শতভাগ আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় আমাদের উৎপাদন খরচ যেখানে গিয়ে ঠেকেছে, সেই তুলনায় আমরা বাজারে দাম বাড়াতে পারছি না। কারণ বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও সীমিত। এর ওপর এলসি খুলতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর নানা রকমের জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কারখানায় নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ বাড়ছে। একই সাথে লাইটার জাহাজ ও ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ভেতরের পরিবহন খরচও এখন অনেক বেশি। সব মিলিয়ে সিমেন্ট খাত বড় ধরণের সংকটে পড়েছে।  দেশের শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক মনে করেন, সিমেন্ট শিল্পকে বাঁচাতে হলে সবার আগে কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার নিয়ম সহজ করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ডলারের বেশি দাম না ধরে সঠিক ও যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সিমেন্টের ওপর বসানো অগ্রিম আয়কর ও অন্যান্য ট্যাক্স কমানো দরকার। দেশের উন্নয়নের গতি সচল রাখতে সিমেন্ট শিল্পকে রক্ষা করা এখন সরকারের বড় দায়িত্ব।
 Visit www.businesstoday24.com এবং আমাদের সাথেই থাকুন।