Home First Lead চট্টগ্রামে মার্কিন তুলার ওয়্যারহাউজ: কমবে সময়, কমবে উৎপাদন ব্যয়

চট্টগ্রামে মার্কিন তুলার ওয়্যারহাউজ: কমবে সময়, কমবে উৎপাদন ব্যয়

কামরুল  ইসলাম, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তুলা আমদানিকারক দেশ। প্রতি বছর কাঁচামালটি আমদানিতেই ব্যয় হয় প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। গুণগত মানের দিক থেকে আমেরিকার উচ্চমানের তুলা বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর জন্য সেরা হলেও সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে তা আমদানিতে শিপমেন্টসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া মেটাতে প্রায় ৬০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়। চট্টগ্রামে মার্কিন তুলার একটি বাফার স্টক বা টার্মিনাল থাকলে এই সময় নেমে আসবে মাত্র ২ থেকে ৩ দিনে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা কার্যকরী মূলধনের সাশ্রয় হবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রামে এই সুবিধা গড়ে উঠলে কাঁচামাল সংগ্রহের সময় ও অর্থ যেমন বাঁচবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দামের আকস্মিক ওঠানামার ঝুঁকি থেকেও দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প সুরক্ষিত থাকবে বলে অভিমত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন  ( বিটিএমএ ) নেতৃবৃন্দের।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণভাবে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ তুলা উৎপাদিত হয় (বছরে প্রায় ২ লাখ থেকে ২.৫ লাখ বেলের মতো)। ফলে চাহিদার বাকি ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আমদানিতে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। গুণগত মানের দিক থেকে সেরা হওয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় মিলগুলো আমেরিকার উচ্চমানের তুলা আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানির হিস্যা মোট চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ বা তার বেশি।
 স্পিনিং মিলগুলোর তুলার সবচেয়ে বড় উৎস হলো পশ্চিম আফ্রিকা ও সামগ্রিকভাবে আফ্রিকার দেশগুলো। মোট আমদানির প্রায় ৩৫ থেকে ৪১ শতাংশ আসে বেনিন, মালি, বুর্কিনা ফাসো, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া এবং জিম্বাবুয়ের মতো দেশ থেকে। আফ্রিকার তুলা মানসম্মত এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারত বাংলাদেশের তুলা আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম একক উৎস।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি ও সফল পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা মাহমুদ হাসান খান জানান: “পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজারে এখন দ্রুত পণ্য সরবরাহ বা ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুলা আমদানির সময় কমে গেলে আমরা বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী খুব কম সময়ে পোশাক রপ্তানি করতে পারব। আমেরিকা যদি চট্টগ্রামে তাদের তুলার স্টক রাখার ব্যবস্থা করে, তবে তা হবে বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।”
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন:”আমেরিকা থেকে তুলা আসতে যে দীর্ঘ সময় লাগে এবঙ  তার জন্য আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে আটকে রাখতে হয়। চট্টগ্রামে যদি মার্কিন তুলার একটি হাব তৈরি হয়, তবে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে কাঁচামাল কিনতে পারব। এতে আমাদের লিড টাইম (পণ্য তৈরির সময়) অনেক কমে যাবে এবং উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।”
চট্টগ্রামের একজন শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ওমেট্রোপলিটন চেম্বার নেতা বলেন: “চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত। এখানে একটি মার্কিন তুলা টার্মিনাল স্থাপন করা হলে কেবল সময় ও অর্থই বাঁচবে না, বরং কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজার ওঠানামার যে ঝুঁকি থাকে, তা থেকেও আমাদের দেশীয় শিল্প রক্ষা পাবে। আমরা আশা করি উভয় দেশের সরকার এ বিষয়ে দ্রুত একটি কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।”
বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমেরিকা থেকে তুলা আমদানি বৃদ্ধি একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে মার্কিন তুলা আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ‘ডাবল ফিউমিগেশন’ (বাধ্যতামূলক দুইবার কীটনাশক বাষ্পীকরণ পরীক্ষা) নীতি শিথিল করায় মার্কিন তুলা সরাসরি বন্দরে খালাস করা সহজ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে একটি মার্কিন তুলা টার্মিনাল স্থাপন করার প্রস্তাবটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই টার্মিনাল বা বাফার স্টক সুবিধা চালু হলে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।