Home First Lead স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু: দায় কার?

স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু: দায় কার?

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: সীতাকুণ্ডের উপকূলজুড়ে লোহার স্তূপে আবারও তাজা রক্তের দাগ। ভাটিয়ারীর ‘ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে’ বিষাক্ত গ্যাস লিকেজে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জেঁকে বসা কাঠামোগত অবহেলা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতার এক রক্তাক্ত দলিল।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে প্রাণ হারানো এই ৯ শ্রমিকের মধ্যে একই পরিবারের দুই সহোদরও রয়েছেন, যাদের নিথর দেহ মর্গের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে থাকতে দেখে পুরো উপকূলীয় এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
প্রশ্ন উঠেছে অত্যন্ত স্পষ্ট—এভাবে আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে প্রশাসনের? আর কত শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে নিশ্চিত হবে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা?
পুনরাবৃত্তি হওয়া ট্র্যাজেডি
সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে গ্যাস বিস্ফোরণ কিংবা বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম নয়। বিগত বছরগুলোতে বারবার একই ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিবারই শ্রমিক নিহত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সব ফাইল চাপা পড়ে যায়।
কাজের ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম (পিপিই), স্বয়ংক্রিয় গ্যাস ডিটেক্টর ও জরুরি শ্বাসযন্ত্র ছাড়া বিষাক্ত প্রকোষ্ঠে শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এখানে যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। লাভজনক ব্যবসার পেছনে শ্রমিকদের জীবনকে সস্তা ভেবে নেওয়ার এই সংস্কৃতি দিন দিন আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে।
ছাড়পত্রের নামে প্রহসন
একটি পুরোনো স্ক্র্যাপ জাহাজ সৈকতকরণের (বিচিং) পর কাটিং কাজ শুরু করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর আইনি ও পরিবেশগত ধাপ পার হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাহাজটি সম্পূর্ণ ‘গ্যাস ফ্রি’ বা বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাসমুক্ত কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়া।

উদ্বেগজনক প্রশ্ন: সংশ্লিষ্ট জাহাজের বদ্ধ চেম্বারগুলো আদৌ সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল? যদি গ্যাস থেকেই থাকে, তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তর কোন প্রক্রিয়ায় ‘গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট’ ইস্যু করল? সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকরা কি নিজেরা জাহাজে উঠে প্রতিটি ট্যাঙ্ক ও পাইপলাইন আধুনিক ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, নাকি কেবল টেবিলওয়ার্ক আর নথিপত্র সইয়ের মাধ্যমেই মিলেছে ছাড়পত্র?

শুধু বিস্ফোরক অধিদপ্তরই নয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌবাণিজ্য দপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তদারকি নিয়েও গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। একের পর এক দপ্তরের অনাপত্তিপত্র কীভাবে কোনো কার্যকর পরিদর্শন ছাড়াই একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্ক্র্যাপ জাহাজকে কাটার অনুমোদন দেয়, তা খতিয়ে দেখার এখনই সময়।
আইনি দায় ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি
দুর্ঘটনার পর গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে কেবল ইয়ার্ডের সাধারণ কর্মীদের ওপর দায় চাপিয়ে খালাস পাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে ইয়ার্ড মালিকপক্ষের গাফিলতি এবং অনুমোদন দেওয়া সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশন অনুসরণের দাবি তোলা হলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যে প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত, সেটিকে অবহেলা ও দুর্নীতির ছায়ায় ফেলে পরিচালনা করার কারণেই বারবার সীতাকুণ্ডের সৈকত রূপ নিচ্ছে বধ্যভূমিতে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এনে কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই লাশের মিছিল থামবে না।
ভিজিট করুন www.businesstoday24.com