চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ‘ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেড’ (ফেরদৌস স্টিল)-এর জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বহীনতা ও মালিকপক্ষের চরম অবহেলার এক নারকীয় বহিঃপ্রকাশ। পুরোনো একটি এলএনজি জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বা তরল বর্জ্যের উপস্থিতি পরীক্ষা না করে, ন্যূনতম নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বন্ধের দিনে পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়া এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চালানোর পেছনে শুধুই মালিকপক্ষের বেপরোয়া মুনাফালোভী মানসিকতা কাজ করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপর্যয় কোনোভাবেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) দফায় দফায় নোটিশ ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের তাগিদ দিয়েছিল। তাতেও কর্ণপাত না করায় শ্রম আদালতে মামলা পর্যন্ত দায়ের করা হয়। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নোটিশ ও বিচারাধীন মামলাকে তোয়াক্কা না করে কীভাবে মালিকপক্ষ জাহাজ কাটার কাজ চালিয়ে গেল? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর প্রয়োগের অভাব ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অনুপস্থিতিই মালিকপক্ষকে এমন বেপরোয়া করে তুলেছে।
দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি বহু পুরনো। আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও জাতীয় নীতিমালার কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে উপকূলীয় এই ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকের জীবন যেন সবচেয়ে সস্তা পণ্য। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই তদন্ত কমিটি গঠন ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয় না।
পরিবেশ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া কীভাবে জাহাজ কাটার কাজ চলছিল, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। দায়ীদের কেবল শ্রম আইনের মামুলি জরিমানায় সীমাবদ্ধ না রেখে ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাম্য হতে পারে না।