Home Second Lead ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রী: কেন এত অস্থির ব্রিটিশ রাজনীতি?

১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রী: কেন এত অস্থির ব্রিটিশ রাজনীতি?

কিয়ার স্টারমার
আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: 
১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত কালো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিদায়ী ভাষণ দেওয়াটা যেন গত এক দশকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের জন্য একটি নিয়মিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে গত দশ বছরে ব্রিটেন মোট ছয়জন প্রধানমন্ত্রীকে দেখল। ডেভিড ক্যামেরন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কিয়ার স্টারমার পর্যন্ত—নেতৃত্বের এই দ্রুত পরিবর্তন বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
কিন্তু কেন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও পরিপক্ক গণতন্ত্রের এই দেশটিতে এত চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলো? এর পেছনে গভীর কাঠামোগত, অর্থনৈতিক এবং দলীয় কোন্দলের সমীকরণ রয়েছে।
১. ব্রেক্সিট: রাজনৈতিক মেরুকরণের মহাবিস্ফোরণ
ব্রিটিশ রাজনীতির এই দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়া) গণভোট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন দলের ভেতরের কোন্দল থামাতে এই জুয়া খেলেছিলেন, কিন্তু গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসায় তাকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর থেরেসা মে ইইউ-এর সাথে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নেন। ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করে বরিস জনসন ক্ষমতায় টিকলেও, এটি ব্রিটিশ সমাজ ও দলগুলোর ভেতর এমন এক মেরুকরণ তৈরি করেছে যা আজও নিরাময় হয়নি।
২. অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও জীবনযাত্রার সংকট
বিগত এক দশকে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় থমকে গেছে। এর ওপর করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রেকর্ড মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনৈতিক এই সংকট সামাল দিতে গিয়ে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন। লিজ ট্রাস মাত্র ৪৫ দিনের জন্য ক্ষমতায় এসে কর ছাড়ের এক চরম বিতর্কিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যা ব্রিটিশ পাউন্ডের দরপতন ঘটায় এবং দেশের আর্থিক বাজারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফলে রেকর্ড কম সময়ে তাকেও পদত্যাগ করতে হয়।
৩. দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মারপ্যাঁচ
ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে না, বরং তারা স্থানীয় এমপি নির্বাচন করে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যেকোনো সময় তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে। কনজারভেটিভ পার্টি তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার তাড়নায় বারবার দলীয় ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বদলেছে। বরিস জনসন করোনা লকডাউনের মধ্যে পার্টিগেট কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দলের ভেতরের বিদ্রোহে ক্ষমতা হারান। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া ঋষি সুনাকও ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলকে রক্ষা করতে পারেননি।
৪. নতুনদের ওপর ভোটারদের দ্রুত মোহভঙ্গ
২০২৪ সালে দীর্ঘ ১৪ বছর পর লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন। ভোটাররা আশা করেছিলেন তিনি হয়তো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করবেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, কঠোর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জনমনে দ্রুত বাড়তে থাকা অসন্তোষের কারণে মাত্র দুই বছরের মাথায় তাকেও বিদায় নিতে হলো। ভোটারদের এই তীব্র ‘অ্যান্টি-ইনকম্বেন্সি’ বা ক্ষমতাসীনদের প্রতি দ্রুত বিতৃষ্ণা এখন ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
এক নজরে গত এক দশকের ছয় প্রধানমন্ত্রী
ডেভিড ক্যামেরন (২০১০-২০১৬)
জুন ২০১৬

ব্রেক্সিট গণভোটে পরাজয়ের পর পদত্যাগ করেন।

থেরেসা মে (২০১৬-২০১৯)
মে ২০১৯

সংসদে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নেন।

বরিস জনসন (২০১৯-২০২২)
জুলাই ২০২২

‘পার্টিগেট’ ও একের পর এক নৈতিক কেলেঙ্কারির জেরে পদত্যাগে বাধ্য হন।

লিজ ট্রাস (২০২২)
অক্টোবর ২০২২

বিতর্কিত মিনি-বাজেটের কারণে মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন (ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম)।

ঋষি সুনাক (২০২২-২০২৪)
জুলাই ২০২৪

সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে কনজারভেটিভদের রেকর্ড পরাজয়ের পর বিদায় নেন।

কিয়ার স্টারমার (২০২৪-২০২৬)
জুন ২০২৬

অর্থনৈতিক সংকট ও জনপ্রিয়তা ধসের মুখে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ চাপে পদত্যাগ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়। এটি আসলে দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বিদলীয় কাঠামোর দুর্বলতা এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার সম্মিলিত ফল। যতক্ষণ না পর্যন্ত অর্থনীতিতে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে, ততক্ষণ ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের এই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা বন্ধ হওয়ার লক্ষণ কমই দেখা যাচ্ছে।
গত এক দশকে ব্রিটেনের এই রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনার মূল্যবান মন্তব্য নিচে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com পেজটি ফলো করে আমাদের সাথেই থাকুন।