বিষের ছায়ায় কৃষি ও জনস্বাস্থ্য: পর্ব-৮
তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: দেশে কৃষি খাতে কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু কঠোর আইন ও নীতিমালা থাকলেও মাঠের বাস্তবতা সে রকম নয়। নিবন্ধন, আমদানি, বিক্রি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার, প্রতিটি ধাপেই সরকারের নিয়মকানুন স্পষ্ট হলেও প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় কৃষক থেকে পরিবেশ–সবাইকেই বিপদের মুখে পড়তে হচ্ছে। আইন আছে, কিন্তু তার কার্যকারিতা অনেক জায়গাতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কীটনাশক ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, প্রতিটি রাসায়নিকের নিবন্ধন, পরীক্ষণ, বিক্রয় কেন্দ্রের লাইসেন্স, ক্রেতা-ব্যবহারকারীর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রামীণ হাট থেকে শুরু করে উপজেলা শহরের দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়—সংখ্যাগরিষ্ঠ দোকানে নেই বিক্রি–বিধির তালিকা, নেই প্রশিক্ষিত বিক্রেতা। বেশিরভাগ দোকানদার নিজেরাই বোঝেন না কোন কীটনাশক কোন ফসল ও কোন রোগের জন্য। ফলে কৃষকদের ভুল পরামর্শ দেওয়া বা বেশি মাত্রা ব্যবহারের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে।
খাত–সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেন, মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবই মূল সমস্যা। দেশের ৬৮ হাজার গ্রামজুড়ে রাসায়নিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য হাতে গোনা কিছু কর্মকর্তার ওপরই দায়িত্ব পড়ছে। তারা নিয়মিত মনিটরিং তো দূরের কথা, অনেক সময় অভিযোগ পেলেও তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং মাঠপর্যায়ে সচেতনতার বিস্তার। কিন্তু এসবের ঘাটতি থাকায় নকল, নিষিদ্ধ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমছে না। অসংগঠিত বাজার ব্যবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় সহজেই নিম্নমানের বা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজারে ছাড়তে পারছে।
ফলে একই রাসায়নিক বারবার মাটিতে জমে গিয়ে মাটি উর্বরতা হারাচ্ছে, পানি দূষিত হচ্ছে, কৃষকের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। আর এই সবকিছুর বড় প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কৃষি বিভাগের যৌথ তদারকি বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয়। বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও কঠোরতা না থাকলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সমাধানের পথ সবাই জানে—কঠোর নজরদারি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ল্যাব–পরীক্ষা, কৃষক–বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ, এবং সচেতনতার বিস্তার। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এই পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে মাঠে নামবে কবে?









