বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বন্দরের বহির্নোঙরেঅবস্থানরত একটি মাদার ভেসেল থেকে নির্ধারিত গতিতে গম খালাস না করায় শিপিং এজেন্ট এশিয়া বাল্ক মেরিটাইম (প্রাঃ) লিঃ-কে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ১৭ আগস্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের এক আদেশে এই জরিমানা আরোপ করা হয়। একই সাথে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে বন্দর থেকে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির তালিকাভুক্তি বাতিল করারও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ১ আগস্ট ৫১ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায় মার্শাল আইল্যান্ড পতাকাবাহি ১৯ বছরের পুরনো জাহাজ’এমভি সান শাইন’। বহির্নোঙরে জাহাজজট কমাতে এবং খাদ্যশস্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত ১০, ১১, ১২ ও ১৩ আগস্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্টদের একাধিক সমন্বয় সভা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে জাহাজটি থেকে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫ হাজার মেট্রিক টন হারে গম খালাস করতে হবে। কিন্তু পরবর্তীতে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই জাহাজ থেকে সভার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে এবং টানা তিন দিন জাহাজটি থেকে কোনো গমই খালাস করা হয়নি।
বন্দর কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমদানি করা খাদ্যশস্য খালাসে এমন চরম স্থবিরতার কারণে বহির্নোঙরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং মহলে বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। এর পাশাপাশি সময়মতো পণ্য বাজারে না পৌঁছালে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। বাজারে অস্থিতিরা তৈরির অপপ্রচেষ্টায় সহায়তা এবং বন্দরের ভাবমূর্তি নষ্ট করার দায়ে এশিয়া বাল্ক মেরিটাইমের ওপর ১০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করে তা ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ পে-অর্ডারের মাধ্যমে অতিসত্বর বন্দর তহবিলে জমার নির্দেশ দেওয়া হয়।
শিপিং ও লজিস্টিকস তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাহাজটিতে বহন করা পণ্যটি ছিল এফআইও শর্তের কার্গো। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য অনুযায়ী, এফআইও কার্গোর ক্ষেত্রে জাহাজে পণ্য ওঠানো এবং নামানোর সার্বিক খরচ ও দায়িত্ব জাহাজের মালিকের আওতামুক্ত থাকে এবং তা আমদানিকারকের ওপর বর্তায়। বাংলাদেশে প্রচলিত আমদানি-রপ্তানি রীতি অনুযায়ী, আমদানিকারকের পক্ষে পণ্য খালাসের যাবতীয় মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে তাদের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এক্ষেত্রে শিপিং এজেন্টের কাজ মূলত জাহাজের মাস্টারকে প্রতিনিধিত্ব করা এবং ব্যাংকিং ও কাস্টমস প্রক্রিয়া শেষে আমদানিকারককে ডেলিভারি অর্ডার বা ডিও ইস্যু করা। শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে ডিও গ্রহণের পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাইটার জাহাজ বুকিং, স্টিভিডোরিং দল নিয়োগ এবং কার্গো খালাসের কাজ বাস্তবায়ন করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পণ্য খালাসের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের হাতে থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। অবশ্য বিদ্যমান বন্দর আইন ও রেগুলেশন অনুযায়ী বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের বিপরীতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে একমাত্র আইনি ও নিবন্ধিত স্থানীয় প্রতিনিধি হলেন সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট। বন্দরে কোনো বিদেশি জাহাজ পৌঁছানোর পর তার কার্যক্রম, বার্থিং সমন্বয় ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সরাসরি শিপিং এজেন্টের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করে।
বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ: বহির্নোঙরে খাদ্যশস্য খালাস সমন্বয়ের সভায় শিপিং এজেন্ট সশরীরে উপস্থিত থেকে খালাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বন্দর প্রশাসনের দৃষ্টিতে, লাইটারিং কার্যক্রমে কোনো সমন্বয়হীনতা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তা বন্দর ট্রাফিক বিভাগকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করে সমাধান করার দায়িত্বও স্থানীয় এজেন্সির। বন্দর কর্তৃপক্ষ তাই সরাসরি আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে নোটিশ না দিয়ে সামগ্রিক অপারেশনের মূল সমন্বয়ক হিসেবে শিপিং এজেন্টের ওপরই দায় চাপিয়েছে।