বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, বান্দরবান: পার্বত্য চট্টগ্রামের উঁচু-নিচু পাহাড় আর সবুজের বুক চিরে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের নাম এখন ‘গয়াল’। এক সময় একে কেবল গভীর বনের প্রাণী মনে করা হলেও, বর্তমানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ঘরে ঘরে এটি লালন-পালন করা হচ্ছে। গয়াল এখন পাহাড়ের মানুষের কাছে শুধু সম্পদ নয়, বরং এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
গয়াল কেন অনন্য?
গয়াল (Bos frontalis) মূলত বন্য গরুর একটি প্রজাতি। এদের গায়ের রং কালো বা গাঢ় বাদামি হলেও চার পা থাকে ধবধবে সাদা। দেখতে ভয়ংকর মনে হলেও এরা বেশ শান্ত স্বভাবের। এদের প্রধান বিশেষত্ব হলো:
সহনশীলতা: পাহাড়ের প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম পরিবেশে এরা অনায়াসেই মানিয়ে নিতে পারে।
খাদ্যভাস: এরা কোনো সাধারণ ঘাস নয়, বরং বুনো লতাগুল্ম ও লবণের প্রতি বেশি আসক্ত। খামারিরা এদের পাহাড়ের ঢালে ছেড়ে দিয়ে চড়ান, যার ফলে লালন-পালন খরচ খুব কম।
পুষ্টিগুণ: গয়ালের মাংসে কোলেস্টেরল কম এবং এটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও নিরাপদ।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
একটি পূর্ণবয়স্ক গয়াল ৩ থেকে ৬ বছর বয়সেই বিক্রির উপযোগী হয়। ওজনভেদে একেকটি গয়াল বাজারে ২ লাখ থেকে শুরু করে ৫-৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় সমতলের মানুষের কাছে গয়ালের চাহিদা আকাশচুম্বী থাকে। অনেক পর্যটকও পার্বত্য অঞ্চলে আসেন শুধুমাত্র এই প্রাণীর দেখা পেতে বা এর মাংসের স্বাদ নিতে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) গয়াল সংরক্ষণে নিরলস কাজ করছে। তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্যগুলো হলো: ১. জেনেটিক ম্যাপিং: গয়ালের আদি বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানো। ২. ইন-সিটু কনজারভেশন: পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশেই তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষিত এলাকা চিহ্নিত করা। ৩. প্রশিক্ষণ: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও স্থানীয় যুবকদের আধুনিক খামারি হিসেবে গড়ে তোলা।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ
এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। গয়ালের জন্য সংরক্ষিত কোনো চারণভূমি নেই। এছাড়া দুর্গম এলাকায় উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং খুরারোগের মতো মড়ক অনেক সময় বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সরকার যদি পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ ‘গয়াল জোন’ ঘোষণা করে এবং পর্যাপ্ত ঋণ সহায়তা দেয়, তবে এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ হতে পারে।
গয়াল কেবল পাহাড়ের ঐতিহ্য নয়, এটি আমাদের জাতীয় সম্পদের অংশ। সঠিকভাবে পরিচর্যা ও গবেষণার প্রসার ঘটলে গয়াল হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ের ‘কালো মানিক’, যা কেবল দরিদ্র খামারিদের ভাগ্য বদলাবে না, বরং দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে রাখবে অনন্য ভূমিকা।










