বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের গ্রামীণ অর্থনীতি। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পশু লালন-পালন, পশুখাদ্য উৎপাদন এবং বেচাকেনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বাণিজ্যিক ব্যস্ততা। গ্রামীণ অঞ্চলের প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ী—সবার মাঝেই এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি আর ব্যস্ততার আমেজ।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে স্থানীয় খামারগুলোতেই পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে আনোয়ারা, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, হাটহাজারী এবং মিরসরাই উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা দেশি ও হাইব্রিড জাতের গরু-মহিষ মোটাতাজাকরণে দিনরাত পার করছেন। ক্ষতিকর হরমোন বা ওষুধ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খড়, কুঁড়ো, খৈল ও সবুজ ঘাস খাইয়ে পশুগুলো বড় করা হয়েছে বলে দাবি খামারিদের।
গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চট্টগ্রামে পশুর মান এবং সংখ্যা দুই-ই বেড়েছে। অনেক শিক্ষিত যুবক ও প্রবাসী দেশে ফিরে বাণিজ্যিকভাবে বড় বড় ডেইরি ও ক্যাটল ফার্ম গড়ে তুলেছেন, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে গোখাদ্যের বাড়তি দাম নিয়ে খামারিদের মনে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও, বাজারে পশুর ভালো দাম পাওয়ার ব্যাপারে তারা বেশ আশাবাদী।
পটিয়া উপজেলার খামারি হারুনুর রশিদ জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে গরুকে মোটাতাজা করা হয়েছে। শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলার পশুর হাটগুলোতে এসব গরুর চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। যদি ভারতীয় বা বাইরের পশুর অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়, তবে স্থানীয় খামারিরা এবার বেশ লাভবান হবেন।
কোরবানির এই বিশাল আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় খামারি, প্রান্তিক খড় বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আনোয়ারা উপজেলার ডেইরি খামারি মোহাম্মদ লোকমান বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে আমি কোরবানির ঈদ লক্ষ্য করে গরু প্রস্তুত করছি। এবার গোখাদ্যের দাম অনেক বেশি হলেও পশুর মান খুব ভালো হয়েছে। আমার খামারের বেশিরভাগ গরু ইতিমধ্যে পাইকাররা এসে দেখে গেছেন। আশা করছি এবার ভালো দাম পাব, যা দিয়ে খামারের ঋণ শোধ করে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারব।”
পটিয়া উপজেলার প্রান্তিক কৃষক ও খড় ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন জানান, “কৃষিকাজের পাশাপাশি এবার আমি খড় এবং ঘাস শুকিয়ে মজুত করেছিলাম। ঈদের এই সময়ে পশুখাদ্যের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। খামারিরা সরাসরি মাঠ থেকে এসে ভালো দামে খড় কিনে নিচ্ছেন। কোরবানির এই মৌসুমটি আমাদের মতো গরিব কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের এক বড় আশীর্বাদ।”
হাটহাজারী এলাকার মৌসুমি চামড়া ও পশু ব্যবসায়ী আকরাম হোসেন বলেন, “আমরা যারা বছরজুড়ে ছোট ছোট ব্যবসা করি, কোরবানির ঈদ এলে আমাদের কর্মসংস্থান বদলে যায়। এখন থেকেই হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা দেখছি। এবার বাজার বেশ চাঙ্গা। আশা করছি পশু কেনাবেচায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কম থাকবে এবং আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সঠিক লভ্যাংশ ঘরে তুলতে পারব।”
কোরবানির ঈদকে ঘিরে কেবল পশু বিক্রিই নয়, এর সাথে যুক্ত অন্যান্য গ্রামীণ খাতও সমানতালে চাঙ্গা হচ্ছে।
১. পশুখাদ্য হিসেবে খড়, ভুসি আর ঘাসের ব্যবসা এখন তুঙ্গে, যা গ্রামীণ কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে। ২. কাস্তে, দা, ছুরি ও বঁটি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামারপাড়ার কারিগররা। উপকূলীয় ও গ্রামীণ অঞ্চলের কামারশালাগুলো থেকে দিনরাত ভেসে আসছে হাতুড়ি পেটানোর শব্দ। ৩. পশুর হাটগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পরিবহন খাত, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা এবং অস্থায়ী হোটেল-দোকানপাটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিভিন্ন পশুর হাটে জালিয়াতি ও অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন বসানোর পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করবে। এছাড়া অনেক খামারি এবার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি খামার থেকেই পশু বিক্রি করছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া এনে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন কোরবানির ঈদ চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে শুরু করে মিরসরাই পর্যন্ত পুরো গ্রামীণ জনপদে এক বিশাল অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি করেছে।