Home চট্টগ্রাম মেজবানির দেশে কোরবানির হাটে সওদাগরি আভিজাত্য 

মেজবানির দেশে কোরবানির হাটে সওদাগরি আভিজাত্য 

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম। সওদাগরদের দেশ, বড়লোকদের শহর। ব্যবসা-বাণিজ্যের এই রাজধানীতে যেকোনো উৎসবের রঙ একটু বেশিই জমকালো। তবে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এলে চট্টগ্রামের এই আভিজাত্য যেন এক ভিন্ন মাত্রায় রূপ নেয়।
এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর কাছে কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি তাদের সামাজিক মর্যাদা, বংশীয় ঐতিহ্য এবং শক্তির এক অলিখিত প্রতিযোগিতা।
কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসলেই এখানকার হাটগুলোতে শুরু হয় এক অন্যরকম উন্মাদনা। সাগরিকা বাজার,  কর্ণফুলী পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মুখে মুখে ঘোরে বড় বড় গরুর নাম। ‘কালা মানিক’, ‘পাহাড়ী বাবু’, ‘বাহাদুর’—এমন সব বাহারি নামের বিশালাকৃতির গরুর প্রধান গন্তব্যই থাকে চট্টগ্রামের নামী-দামী সওদাগরদের বাড়ি। কে কত বড় গরু কিনলেন, কার গরুর ওজন কত বেশি, আর কার গরুর দাম কত লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেল—তা নিয়ে পাড়া-মহল্লায় রীতিমতো চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে।
 সওদাগর বাড়ির সন্তানরা হাটে গিয়ে লাখ লাখ টাকার গরু বুকিং দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। এটি তাদের কাছে বংশীয় আভিজাত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামের এই কোরবানির প্রতিযোগিতায় যোগ হয়েছে এক নতুন সমীকরণ। শুধু দেশী বা ভারতীয় বড় জাতের গরুতেই এখন আর সীমাবদ্ধ নেই সওদাগরদের নজর। আভিজাত্যের এই দৌড়ে নিজেদের আরও একধাপ এগিয়ে রাখতে এখন যুক্ত হয়েছে মরুভূমির উট এবং দুম্বা।
রাজস্থানি উট কিংবা দুম্বার খাঁচা যখন চট্টগ্রামের কোনো সওদাগর বাড়ির সামনে এসে নামে, তখন সেই এলাকায় রীতিমতো মেলা বসে যায়। উৎসুক মানুষ ভিড় জমায় রাজকীয় এই পশুদের একনজর দেখতে। লাখ টাকার গরু ছেড়ে এখন কোটি টাকার উটের দিকে ঝুঁকছেন চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। যার গোয়ালে উট কিংবা দুম্বা থাকে, কোরবানির হাটে তার সামাজিক অবস্থান যেন এক নিমেষেই সবার ওপরে চলে যায়।
আভিজাত্য বনাম ত্যাগের মহিমা
একই উঠানে ১০টি, ১৫টি বা তারও বেশি গরু কোরবানি দেওয়ার ঘটনা চট্টগ্রামে বেশ সাধারণ। মেজবানির দেশ চট্টগ্রামে কোরবানির মাংসের একটা বড় অংশই ব্যয় হয় আত্মীয়-স্বজন এবং সাধারণ মানুষের ভুরিভোজে।
তবে এই উৎসবের আড়ালে যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা কাজ করে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বড় গরুর পিঠে চাকা বেঁধে বা বর্ণিল সাজে সাজিয়ে যখন সওদাগররা বাড়ি নিয়ে যান, তখন তা কেবল ধর্মীয় ত্যাগ থাকে না, হয়ে ওঠে বিত্তের এক বিশাল প্রদর্শনী।
চট্টগ্রামের এই সওদাগরি সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। যুগের সাথে সাথে হয়তো পশুর ধরন বদলেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রচারের ধরণ বদলেছে, কিন্তু নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার সেই চিরন্তন ‘চিটাগাংয়্যা’ ঐতিহ্য রয়ে গেছে আগের মতোই।