কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: ইউরোপের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (Ship Recycling) শিল্পে এক নতুন মোড় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাহাজ মালিকরা যাতে আইনের ফাঁকফোকর গলে বিদেশের অনিরাপদ সমুদ্রসৈকতে বিষাক্ত বর্জ্য ও জাহাজ পাঠাতে না পারেন, সেজন্য ইউরোপীয় শিপ রিসাইক্লিং রেগুলেশন (EU SRR) এবং বর্জ্য চালান সংক্রান্ত আইনে আমূল পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
ইন্ডাস্ট্রিঅল ইউরোপ এবং এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমান আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক মালিক পরিবেশগত মানদণ্ড এড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনিরাপদ ইয়ার্ডে জাহাজ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এটি বন্ধ করতে ‘বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ’ (Beneficial Ownership) বা জাহাজের প্রকৃত মালিকের পরিচয় নিশ্চিত করাকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আইনের ফাঁকফোকর ও মালিকদের কৌশল:
বর্তমানে অনেক জাহাজ মালিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিয়ম এড়াতে শেষ মুহূর্তে জাহাজের পতাকা (Flag) পরিবর্তন করেন অথবা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর করেন। ফলে ইউরোপীয় বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজটি শেষ পর্যন্ত কোনো অনিরাপদ ইয়ার্ডে পৌঁছালেও মূল মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সংগঠনগুলোর দাবি, যদি জাহাজের মূল অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী বা প্রকৃত মালিককে আইনের আওতায় আনা যায়, তবে এই জালিয়াতি বন্ধ হবে। এটি নিশ্চিত করলে:
ইউরোপীয় মালিকানাধীন জাহাজের বড় অংশ ইউরোপের আধুনিক ইয়ার্ডেই ফিরে আসবে।
বিষাক্ত বর্জ্য (যেমন: অ্যাসবেস্টস, পিসিবি) অনিরাপদভাবে বিদেশের পরিবেশে ছড়ানো বন্ধ হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অবৈধভাবে বর্জ্য রপ্তানি বন্ধে ‘বর্জ্য চালান আইন’ (Waste Shipment Regulation) আরও কার্যকর হবে।
শিল্পের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। ইউরোপের মালিকানাধীন ৩৫% জাহাজের মাত্র ১% বর্তমানে ইইউ অনুমোদিত ইয়ার্ডে আসে। যদি আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করে এই জাহাজগুলো ইউরোপে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে তা মহাদেশটির ইস্পাত ও কাঁচামাল নিরাপত্তার (Raw Material Autonomy) গ্যারান্টি দেবে।
ইন্ডাস্ট্রিঅল ইউরোপের মতে, কঠোর আইনি কাঠামো নিশ্চিত করলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ইউরোপীয় শ্রমিকদের জন্য উচ্চমানের ও নিরাপদ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ‘বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ’ শনাক্তকরণই হবে এই পরিবর্তনের প্রথম এবং প্রধান ধাপ।
আগামী দিনের পদক্ষেপ:
ইউরোপীয় কমিশন বর্তমানে তাদের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজি’ বা শিল্প সামুদ্রিক কৌশল সাজাচ্ছে। পরিবেশবাদী এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, এই কৌশলে যেন জাহাজ মালিকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর সামাজিক ও পরিবেশগত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।